শহুঃ মহারাজ

সিআ ম্যোষ্য পাবত্িজ্শার্ল ও: ভি: ১০০ শ্যামাচরশ দে স্কুঁটি, কুং্সকাতা ২১৩১ ৩৭২৭

হিমালয় তৃতীয় খণ্ড প্রথম প্রকাশ, পৌষ ১৩৯১

প্রচ্ছদপট : কাঞ্চনজঙ্ঘা তিস্তা অঙ্কন : মণি সেন (শিল্পীর কন্যা শ্রীমতী নীলিমা রায়ের সৌজন্যে) বিন্যাস : পূর্ণেন্দু রায়

111551-5948 ৬01111

4 00116010101) 01 10100108895 011 13111101795, 10001151760 0 1৬11010 & 01051) 70011510615 7৮1. 100. 10 9190170 01801017106) 90621, 26011918100 073

মিত্র ঘোষ পাব্লিশার্স প্রাঃ লিঃ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ম্রীট, কলকাতা ৭০০ ০৭৩ হইতে পি. দত্ত কর্তৃক প্রকাশিত ইউনিক কালার প্রিন্টার্স, ২০এ পটুয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ হইতে মুদ্রিত

ভূমিকা : ডঃ অরুণকুমার বসু লাদাখের পথে

| ক)

৯৭৫ ৩৩৭

ভূমিকা

শঙ্কু মহারাজের ভ্রমণকাহিনী একই সঙ্গে চোখে-দেখার ক্ষুধা এবং জ্ঞানে-জানার তৃষ্ণা মেটায়। দুপায়ে হাটতেন সেকালের পর্যটক, আর একালের পর্যটক দুহাতে তথা সঞ্চয় করেন। হিমালয় তো শুধু দ্রষ্টবা নয়, জ্ঞাতবাও। হিমালয় জ্ঞানের বিশ্বকোষ। তার জনপদ-বৈচিত্র্য, তূপ্রকৃতির শতসহস্্র বিশিষ্টতা, পদে পদে রম্য-ভয়ংকরের পহাবস্থান, তার আবহাওয়ার অঞ্চলগত পরিবর্তন, শীতাতপের রূপান্তর, লোকালয়ের সংস্কৃতি, ভাষা, পরিধেয় আহার্যের বিভিন্নতা___এগুলি সমতলবাসীর কাছে অবজ্ঞাত ভুবনের রহসাগ্রন্থের মলাট খুলে দেয়। একই সঙ্গে হিমালয়ের দুর্গম পথের ইতিহাস, জনবসতি স্থাপনের ইতিহাস, মনুষা-অধুষিত এক একটি সভাতাখণ্ডের ইতিহাস, শিখরআরোহণ, সড়কনির্মাণ, সেতুস্থাপন, দেবস্থান গড়ে তোলা, রাজাস্থাপন, যুদ্ধবিগ্রহ, আইন-শৃঙ্খলা, সীমান্ত-বিরোধ, বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে সংযোগরক্ষা-_ বহু শত বৎসরের ইতিহাসের এমন অজন্র তথ্য সন্ধানী-কুশলী হাতে চয়ন করেন পর্যটক শঙ্কু মহারাজ। কেবল দৃষ্টিক্ষুধা তৃপ্ত করার ভ্রমণসাহিতা শঙ্কু মহারাজের কৃতা নয়-_-তিনি মননের সন্তারও একই সঙ্গে পরিবেশন করেন। তাই লাদাখ কিংবা বৈষ্ঠোদেবীর তীর্থস্থান_ যেখানেই তিনি পরিক্রমা করেছেন, গিয়েছেন তার নাড়িনক্ষত্র জেনে, আর ফিরে এসেছেন ততোধিক উপার্জনসহ, যা উত্তরকালের পথিক-পর্যটকদের জিজ্ঞাসা নিবারণ করবে।

আরও বিশেষত্ব আছে এই ভ্রমণবৃত্তন্তগুলিতে। পর্যন্ত যারা হিমালয়ের দৃরদুর্গম স্থানগুলি পরিক্রমা করেছেন এবং মনোজ্ঞ ভাষায় সে-সবের বিবরণ লিখেছেন, জলধর সেন থেকে উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত, এঁরা অনেকেই ছিলেন নিঃসঙ্গ পরিত্রাজক। পথে ক্ষণকালের সঙ্লী পেয়েছেন, কিন্তু দল বেঁধে শফর করতে বেরোননি। সেকালে ভ্রমণের দুর্গমতার কারণে নিঃশস্ক অভিযাত্রীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কারণ সহিষ্তার মূল্যে রুদ্রসুন্দরের উপাসনায় সকলে অংশ নিতে পারতেন না। তাই অনেক অভিযাত্রীই প্রায় একক উদ্যোগে সামান্য পাথেয় পথচলতি ক্ষণকালীন সঙ্্রীসাধীর সাহচর্যে দুরধিগম্য অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছেন। একালে পথঘাট অনেক বেশি সুগম হওয়ায়, যানবাহনের সহজ প্রাতুল্যে এবং আর্থিক ব্যয় সাধাসীমায় নেমে আসায় যাত্রীসংখ্যা বেড়েছে। ভ্র্ণণের উৎসাহও আমাদের মনে বহুগুণিত হয়েছে নানা পারিপার্থিক কারণে। এছাড়াও দলবদ্ধ ভ্রমণের একটা পদ্ধতিবিদ্যা গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে বহু ব্যবসায়ী ভ্রমণোদ্যোগ-প্রতিষ্ঠান, যাদের আয়োজন-সতর্কতার উপর ভরসা রাখলে ভ্রমণের আনন্দ নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়, অথচ উৎকঠা

দুশ্চিন্তার দায় থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে ভ্রমণে পর্যটনে অভিযানে অংশগ্রহণ করতে করতে শঙ্কু মহারাজের

ক্ষেত্রে, একক, নিঃসঙ্গ ভ্রমণ থেকে দলবদ্ধ সফর, দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই ঘটেছে। তাই তার ভ্রমণসাহিত্যে বাড়তি একটা মাত্রা যোগ হয়ে যায়। তিনি সহ্যাত্রীদের উঞ্ণ সঙ্গ সরব সান্িধোর বাতাবরণ সঙ্গে নিয়েই শফরে বেরোন। তাই তার ভ্রমণ নিছক গন্তব্যের কাহিনী হয় না, তা চলস্তের সজীব ধারাপাত হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের দিনলিপির মতো তিনি চারপাশের মানুষজন সঙ্গরীসজনের কলরব নিয়ে যাত্রা করেন, তাদের সংলাপ সন্তাপ, পরিহাস পরিতাপ সমস্তই তিনি পাঠকদের উপহার দেন। প্রকৃতি আর মানুষ তার বইতে সমান গুরুত্ব পায়। কেবল পর্যটকের নির্দেশনামার জনো তো টুরিস্ট দপ্তর আছে, আর গল্পতোষ পাঠকের জন্যে আছে কল্প-ভ্রমণসাহিত্য। শস্কু মহারাজের বই ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপন নয়-_তা কথাসাহিত্যের লক্ষণাক্রান্ত। তাই তীর ভ্রমণে নদী যেমন গুরুত্ব পায় তেমনি পায় নারী। লাদাখের পথে পথে সিন্ধু যেন তারই লীলাবিস্তারিকা সব্বী, সুন্দরের অভিসারে যেমন তিস্তা। আবার লেখকের বাল্যকৈশোর-থেকে-পরিচিত সেই তিস্তার উৎসসন্ধানে যাত্রার বিবরণেও আমাদের নজর কাড়েন তিনি চুংখাং-এর পাশের দোকানের সেই আধুনিকা মালিকানির কথায়, সিনিয়লচুত্ন পথে লজেন্স-চাওয়া সেই সুদর্শনা মালবাহিকার মুখের হাসিতে, বৈষ্ঠোদেবীর মন্দিরপথে তপশিলি বাসন্তী মেদবততী রাজস্থানী মহিলার বর্ণনায়।

হিমালয় যেমন ভ্রমণবিলাসীদের আকর্ষণভূমি, তার শৃঙ্গগুলি তেমনি পর্বতারোহীদের আমন্ত্রণগিরি। একালে পর্বতশৃঙ্গারোহণের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, অনেক বিদ্যালয়েও পর্বতারোহণ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনেক তরুণ পর্বতারোহীই মাঝারি মাপের পর্বতশিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

শঙ্কু মহারাজও কেবল ভ্রমণযোগী নন, তিনি অভিযাত্রীও বটে। তিনি একাধিক পর্বতশৃঙ্গারোহণের উদ্যোগী অংলীদার। তার এইসব অভিযানের সানিধাজনিত অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখেছেন তিনি এবং শূঙ্ববিজয়ের জন্যে তরুণ অভিযাত্রীদের যাবতীয় করণীয় খুঁটিনাটি বিষয়ের অনুপুত্খ নির্দেশ দিয়েছেন।

এই কারণেও তীর গ্রন্থগুলি আমাদের ভ্রমণসাহিতো, বিশেষত হিমালয়-বিষয়ক ভ্রমণসাহিত্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন, “সুন্দরের অভিসারে” সিনিয়লচু পর্বতশৃঙ্গারোহণ-উদ্যোগের একটি ডকুমেন্টারি। এই ডকুমেন্টেশনের জন্যে তার নিবিড় অধায়ন, মননের সুদীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব, নেপথ্যের তথ্যসংকলন আমাদের রীতিমতো বিশ্মিত করে। পর্বতারোহীকে দৈনন্দিন প্রতি মুহূর্তের প্রয়োজনের সমস্ত খুঁটিনাটি সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করতে হয়। একটি আপাততুচ্ছ সাবান বস্ত্র বা পদার্থের অভাবে অকন্মাৎ সমস্ত আয়োজন নিষ্কল হয়ে যেতে পারে। “সুন্দরের অভিসারে” পড়েই তো জানা গেল, একটি দেশলাই-এর অভাবে একটি অভিযান ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল (৫ম পরিচ্ছেদ)। শঙ্কু মহারাজ তাই ভ্রমণপথের সমস্ত অঞ্চলের দ্রষ্টবা-সম্পর্কিত সমস্ত জ্ঞাতব্যের সংস্থান রেখে দেন পাঠকের জন্যে। এই সুবিন্যস্ত অন্বেষা, এই সাবধানী সঞ্চয়ন, এই ব্যাপক জরিপ দরকারমতো সেগুলি চিত্রকল্প করে তোলা-__ এই সব গুণ তার ভ্রমণগ্রন্থগুলিকে বন্ততই ইংরেজি সাহিতোর উল্লেখযোগা ভ্রমণ-অভিজ্ঞতামূলক রচনাগুলির মানদণ্ডে উত্তীর্ণ করে বলে বর্তমান ভূমিকাকার বিশ্বাস করেন।

হিমালয়ের প্রতি অভিযানমনস্ক আকর্ষণ বিদেশীদের মধোই বেশি বার ৰার

এযাবং আর কোনো বাংলা ভ্রমণগ্রন্থে আমরা পাই না।

আগেই জেনেছি “বৈষ্জোদেবীর দরবারে' মূলত তীর্থপরিক্রমার বিবরণ, কিন্তু লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষোরই গৌরব। জন্মু শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে কাটরা জনপদ থেকে বৈষ্ঠো দেবীর উদ্দেশে পদযাত্রার সুচনা-_আর সে পথ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যেমন নয়নাভিরাম, মানুষের তৈরি স্বাচ্ছন্দো তেমনি স্ব্তিদায়ক। সমগ্র উত্তরভারতের সর্বত্র-পূজিতা এই দেবীর গুহাতীর্থে প্রায় সারা বৎসরই চলেছে যাত্রীবাহিনী। সেই লোকপ্রবাহের ভিত্রই তো প্রকৃত দৈবমহিমা উদ্ভাসিত হয়। বৈষোদেবীর দরবারে ভ্রযণগ্রন্থে সেই দেবতীর্৫থ মানবতীর্৫থ এককেন্দ্রে মিলিত হয়েছে।

শঙ্কু মহারাজ বৈষ্ঠোদেবীর দরবারে প্রবেশ করেছিলেন লাদাখ ভ্রমণ শেষ করে। লাদাখভ্রমণ যে কোনো হিমালয়-পর্যটকের পক্ষে বিশেষ স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ভারতের প্রতীটি হিমালয়ের সীমান্তে তিববত স্পর্শ করে, সিদ্ধুনদের লীলাভূমি লাদাখে যেতে হয় হিমালয় পেরিয়ে। এই অঞ্চলের জলবায়ু পর্বতশিখর তরুলতা আবহাওয়া হিমালয়ের শীতকম্পিত অঞ্চলের তুলনায় বিচিত্রভাবে স্বতন্ত্র তিববতে প্রচারিত বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি অধ্যায় লাদাখের গুহা-গুক্ষায় স্তত্তিত হয়ে আছে। এই অঞ্চলে একদা স্বয়ং যিশুগ্রিস্ট পদস্থাপন করেছিলেন, সেই মিথ-এর সতাতাই বা কে প্রমাণ করবে? মধা এশিয়ায় প্রবেশের বাণিজাপথ এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। লাদাখ চাঁদের দেশ, রঙিন পাথরের দেশ, পৃথিবীর প্রাচীনতম মনুষাবসতির প্রাকৃতৃমি, এই জাতীয় ইতিহাস-ভূঁগোলের প্রভূত উপকরণে 'লাদাখের পথে" বইটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। শ্রীনগর যেতে লাদাখের জেলা শহর লে পর্যন্ত সুদীর্ঘ বাসযাত্রার পথে পাঠককে বারবার বিরাম নিতে হয়-_অমরনাথ, বলতাল, সোনামার্গ, জোজি লা, দ্রাস, কারগিল, জাসকার, মুলবেখ, রিজং গু্ফা, ফিয়াংগুম্ফা, স্পিতুক গুশ্কা, লে গুম্ফা, তিকসে গুন্ফা, হেমিস গুম্ফা__এইসব মনোহর বিশ্রামনিকেতনে। এই মানসভ্রমণে এই ভূমিকালেখক যে অপরিসীম তৃপ্তি পেয়েছেন এবং স্বশরীরে লাদাখ-ভ্রমণের অক্ষমতায় যে আর তিনি ক্ষুণ্ন নন, এই আনন্দঘন অভিজ্ঞতার পাঠাম্মৃতি নিবেদন করে সর্বশ্রেণীর ভ্রমণরসিক পাঠককে সেই অভিজ্ঞতার শরিক হতে আমন্ত্রণ জানাই।

যার কাছে হিমালয়ের প্রথম পাঠ নিয়েছি, বাংলা সাহিত্যের সেই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক আমার শ্রদ্ধেয় অগ্রজ পরমপ্রিয় পথিকৃৎ

শ্রী প্রবোধকুমার সান্যালের

করকমলে

মানুষ সুন্দর, মাটি সুন্দর, সাগর সুন্দর। আকাশ সুন্দর, বাতাস সুন্দর আর পাহাড় সুন্দর। কিন্ত সবচেয়ে বেশি সুন্দর কি?

বিশ্বের প্রথম মহিলা মহাকাশচারিণী ভ্যালেস্তিনা তেরেস্‌্কোভা যখন মহাকাশ পরিক্রমার পরে পৃথিবীতে ফিরে এলেন, তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল__মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে কেমন দেখায়?

- সুন্দর, অপূর্ব সুন্দর। সে সৌন্দর্য বর্ণনাতীত।

_ পৃথিবীর কোন অংশ সবচেয়ে সুন্দর?

_ তুষারাবৃত হিমালয়।

১৯৬২ সাল। গাড়োয়াল হিমালয়ের নীলগিরি , পর্বত (২১৯২৬৪') অভিযানের আয়োজন করা হচ্ছে। স্টেট্সম্যান পত্রিকা আমাদের সেই অভিযানের সংবাদন্বত্ব ক্রয় করেছিলেন। অভিযানের নেতা অমূল্য সেন আমরা কয়েকজন একদিন পত্রিকার অনাতম কর্ণধার ডেসমণ্ড ডয়েগ-এর চেম্বারে বসে গল্প করছিলাম। ডেসমণ্ড কেবল শিল্পী সাংবাদিক সুলেখক নন, তিনি একজন অভিজ্ঞ হিমালয় অভিযাত্রী। তাই সেদিন কথায় কথায় তীকে প্রশ্ন করেছিলাম- হিমালয়ের সবচেয়ে সুন্দর শৃঙ্গ কি?

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন ডেসমণ্ড-__সিকিমের সিনিয়লচু।

তারপর বন্থু বছর কেটে গিয়েছে। যৌবন অতিক্রম করে গ্রৌঢ়ত্রের প্রায় প্রান্তে পৌঁছেছি। ইতিমধ্যে বহুবার হিমালয়ের গহনগিরি-কন্দরে পরিক্রমা করেছি। কয়েকটি পর্বতাভিযানে অংশ নিয়েছি। দর্শন করেছি অনেক অনিন্দাসুন্দর পর্বতশূঙ্গ। কিন্ত ভুলতে পারিনি সিনিয়লচুর কথা।

যখনই নিভৃতে হিমালয়ের কথা ভাবতে বসেছি, তখুনি মনে পড়েছে ডেসমণ্ড ডয়েগ-এর সেই মন্তব্য। মনে পড়েছে সিনিয়লচু সম্পর্কে সেকালের প্রখাত পর্বতারোহী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হিমালয়-লেখক ফ্র্যাসিস সিডনী স্মাইথের সেই অমর উক্তি-__

17৩ 70050 19010102119 1017050 01 001) *...০, ৬111 522৩ 010) 51101010178 8010 12001 0021 1 01757৩ 15 00৫ 01 11)800255101111, 1115 1190001098০179191৩ 19115 8170 08190500185 05 09511108700 0০17৩811) 01)০ 1০9 100801005 210 5৮/০041)% 5৫8111091-18155 1108655 06 01791 810921715 1১০94.*

বহু বছর ধরে আমি তাই সিনিয়লচুর স্বপ্র দেখেছি। হিমালয়ের পথে পথে প্রচুর পদচারণা করেও সেই 'অনভিগমনের অধীসশ্বরের দুরধিগম্য দেবালয় আর তার বাকা তলোয়ারের মতো গিরিশিরা দর্শনের আকাঙ্কা আমার কিছুমাত্র হ্রাস পায় নি। কিন্ত যাওয়া হয় নি সিকিম, দেখা হয় নি- সিনিয্ললচু।

মাত্র মাস ছয়েক আগের কথা। অফিসে বসে কাজ কর্গছি। হঠাৎ তরুণ পর্বতারোহী অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিনীত দাশগুপ্ত এসে হাজির। ওরা মাঝে মাঝে আসে।

শু 181101)011)1811658 /১0৬৩1008:6" 09 টি, 5. 91501)5--- 10010907) 1939

কাজেই ওদের আগমনকে কোন গুরুত্ব দিলাম না। বসতে বললাম। কিন্তু কুশল বিনিময়ের পরে সহসা অরুণ বলে বসল-_আমরা একটা এক্সপিডিশান করছি। অমূল্যদা নেতৃত্ব করছেন। আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।

-_ না, না! সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠেছি। বলেছি__তোরা তো জানিস, আমি ঠিক করেছি আর কখনও কোনো অভিযানে যাব না।

_ কিন্তু কেন? বিনীত প্রশ্ন করেছে।

উত্তর দিয়েছি-_আমার আর পর্বতাভিযান ভাল লাগে না। ওতে বড় ঝামেলা আর দুশ্চিন্তা। ওর চেয়ে পদযাত্রা অনেক ভাল। কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই। যেখানে খুশি যতদিন খুশি বসে যাও আর নইলে এগিয়ে চলো।

ওরা আমার আপত্তি কানে তোলে নি। অরুণ বলে উঠেছে__অমূল্যদা কিন্তু বলেছেন, আপনাকে আর সুশান্তদাকে নিয়ে যাবেনই। আমরা শুধু আপনাকে সেই কথাটি জানাতে এসেছি।

সুশান্তদা মানে মানবতত্ব বিভাগের বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়

অমূল্য যখন সাব্যস্ত করেছে, তখন ছাড়া পাওয়া মুশকিল। তাই জিজ্ঞেস করেছি_তোরা কোথায় যাচ্ছিস?

বিনীত উত্তর দিয়েছে___সিকিমে। আপনি তো কখনও সিকিম যান নি!

কথাটা মিথো নয়। আর এই না-আসার জন্য মাঝে মাঝেই মনে বেদনা অনুভব করতাম। সিকিম আমাদের প্রতিবেশী রাজা, কতবার দার্জিলিং এসেছি কিন্তু কখনও সিকিমে আসা হয় নি আমার। তাই বলে ফেলেছি__বেশ, অমুল্যকে বলিস, আমি যেতে পারি তোদের সঙ্গে, যদি তোরা জেমু হিমবাহ অঞ্চলে অভিযান করিস।

একটু হেসে অরুণ জিজ্ঞেস করেছে__কেন বলুন তো?

উত্তর দিয়েছি__আমি একবার সিনিয়লচুকে দেখতে চাই।

এবারে ওরা দুজনেই হো হো করে হেসে উঠেছে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছি। একটু বাদে হাসি থামিয়ে বিনীত বলেছে__শুধু আপনি নন শঙ্কুদা, আমরা সবাই সিনিয়লচুকে দেখতে চাই, অমূল্যদা তো বটেই। আর তাই এবারের এই আয়োজন।

চমকে উঠেছি। প্রশ্ন করেছি__মানে?

_ আমরা সিনিয়লচু অভিযানের আয়োজন করছি। আপনাকে যেতে হবে সঙ্গে

- বেশ যাবো।

তারপরে কি ভাবে যে কয়েকটা মাস কেটে গিয়েছে, এখন আর তা মনে করতে পারছি না। টাকা-পয়সা, খাবার-দাবার, সাজ-সরপ্রাম অন্যান্য জিনিসপত্র যোগাড় করা। ইনারলাইন ক্যামেরা পারমিটের ব্যবস্থা করা। শিলিগুড়ি গ্যাংটকে গাড়ি আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করা।

সকলের শুভেচ্ছা সাহায্যে সবই হয়ে গিয়েছে। আমার বহু বছরের স্বপ্ন সতা হতে চলেছে। আমি আজ সুন্দরী সিকিমে চলেছি। সুন্দরের অভিসারে সেই পদযাত্রাই আমার কাহিনীর বিষয়বস্ত।

কিন্তু পদযাত্রা আরম্ভ হবার এখনও দেরি রয়েছে। তার আগে আমাদের কিছু কথা আছে। সেটুকু বলে নেওয়া দরকার।

1 লেখকের “তমসার তীরে তীরে, দ্রষ্টব্য।

কলকাতার ডায়না এসোসিয়েশন এই অভিযানের আয়োজন করেছেন। এটি তাদের প্রথম পর্বতাভিযান। তবে ইতিপূর্বে তারা কয়েকটি রক্‌-ক্লাইন্থিং শিবির হিমালয় পদযাত্রা পরিচালনা করেছেন। এসোসিয়েশনের সভাপতি অমূল্য সেন আমাদের নেতা আর তরুণ সম্পাদক শরদিন্দু ঘোষ অভিযানের সদস্য। ডায়নার সহ-সভাপতি থেকে সদস্য এবং বিধানসভা ভবনের অধ্যক্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা পর্যন্ত অনেকেই এই অভিযানের জন্য অসামান্য সাহাযা করেছেন। আমরা তাদের সবার প্রতি সমান কৃতজ্ঞ। তবু তাদের কয়েকজনের কথা একটু পৃথকভাবে উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে।

প্রথমেই মনে পড়ছে বিধানসভার মার্শাল জয়ন্ত যজুমদারের কথা। এই সদাহাসাময় পরোপকারী পরিশ্রমী যুবকটি সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করেছেন আমাদের সাহায্য করেছেন বিধানসভার সচিব প্রতাপকুমার ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিব রহীন সেনগুপ্ত। এদের সঙ্গে আরও দুটি নামের উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। তারা হলেন-__তাপস কর সমরজিৎ গোস্বামী

বলতে হবে শ্রীমতী স্বপ্রা চক্রবতীর কথা। সে ডায়নার সহ-সম্পাদিকা এবং বিধানসভার কর্মচারী। সুস্রী শিক্ষিতা যুবততী। বিবাহিতা আড়াই বছরের একটি কন্যার জননী। স্বপ্নার নিরলস পরিশ্রম আমাদের স্বপ্রকে বাস্তব রূপ দিতে সবিশেষ সাহাযা করেছে।

আরও তিনটি মানুষের কথা আজ আমার বার বার মনে পড়ছে। তারা 'হলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধাক্ষ সৈয়দ আবুল মনসুর হবিবুল্লাহ্‌, প্রবীণ বিপ্রবী শ্যামানন্দ সেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন।

আমরা যারা পাহাড়-পর্বতে, পদচারণা করি, তারা রাজনীতির সঙ্গে বড় একটা সম্পর্ক রাখি না। তবু এরা আমাদের অতি আপনজন হবিবুল্লাহ্‌ সাহেব আমাদের নানাভাবে সাহাযা করেছেন। তার দেওয়া জাতীয় পতাকাটি নিয়েই আমরা এই অভিযানে চলেছি। শ্যামানন্দবাবু স্বেচ্ছায় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। আর প্রফুল্পবাবু অসুস্থ শরীর নিয়েও হাওড়া স্টেশনে এসে আমাদের বিদায়-শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ১৯৬২ সালে নীলগিরি পর্বত অভিযানে যাবার সময়ও তিনি হাওড়ায় আশীর্বাদ করেছিলেন। সেবার থেকেই আমাদের সিনিয়লচুর ভাবনা শুরু হয়েছে। *

এবারে নিজেদের কথায় ফিরে আসা যাক। “আনলাকি থাটিগ্ন* কথাটা আমাদের অজানা নয়, কিন্তু ভাগ্দোঘষে আমরা এখন তেরোজন। অনিবার্য কারণে শেষ পর্যস্ত ডাঃ স্বপন রায়চৌধুরী, অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় বন্ধুবর অসীমকুমার মুখোপাধ্যায় আসতে পারে নি।” এরা তিনজনেই যথাসাধ্য করেছে। বিশেষ করে অসীম এগিয়ে না এলে আমাদের তথাচিত্র প্রযোজনার প্রস্তাবটি বাতিল করতে হত। অথচ সে নিজেই শেষ পর্যস্ত আসতে পারল না। আর তাই আযরা তেরোজন।

এখন কিন্তু আর তেরো নই। কলকাতা থেকে তেরোজন রওনা হলেও এখন

* লেখকের 'নীল-দুর্গম” “চতুরঙ্গীর অঙ্গনে”, “গঙ্গা-যমুনার দেশে “অমরতীর্থ অমরনাথ' গ্রন্থগুলি দ্রষ্টবা।

আমরা সতেরোজন। দার্জিলিঙের চারজন “হাই অল্টিচ্যড পোর্টার (11/৯) শিলিগুড়িতে আমদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তিনজন শেরপারও আসার কথা ছিল, কিন্তু আসে নি।

পর্ততারোহণ আজ ভারতে একটি শ্রেষ্ঠ “স্পোর্টস” বলে সমাদূত। সরকারও বিশেষ ভাবে পর্বতারোহণের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। তবু ইদানীং দুটি কারণে পর্বতাভিযান প্রায় দুরূহ হয়েছে। প্রথমটি সাজ-সরপ্রামের সমস্যা। কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পরিবর্ধিত সাজ-সরপ্রামের তহবিল প্রায় শূন্য। আর দ্বিতীয়তঃ ভাল চাকরি পেয়ে শেরপারা তাদের বৃত্তি বদলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবকল্যাণ দপ্তর দার্জিলিং হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্স্টিটিউটের অধাক্ষ গ্রুপ ক্যাপ্টেন অজিতকুমার চৌধুরীর সাহাযো আমাদের সাজ-সরঞগ্জামের অভাব মিটেছে। কিন্ত অগ্রিম টাকা দিয়ে এখনও শেরপা পাই নি। শেরপা ক্রাইন্বার্স এসোসিয়েশনের সম্পাদিকা তেনজিংকন্যা মিসেস পেম্‌ অবশ্য বলেছেন-__শেরপারা সিকিমেই একটি অভিযানে এসেছে। তারা গ্যাংটকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে।

আমরা ১১ই মে কামরূপ এক্সপ্রেসে হাওড়া থেকে রওনা হয়ে ১২ মে শিলিগুড়ি পৌঁছেছি। স্থানীয় কয়েকজন উৎসাহী যুবক স্টেশনে আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মধো অমল পাল, তমাল দে, রবীন ঘোষ, অমলেশ গোস্বামী, অনিমেষ বসু, ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় দীপক মিত্র প্রভৃতির নাম উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। উল্লেখ করতে হবে তালের বাবা শীতলচন্দ্র দে মহাশয়ের কথা। তিনি সেচ বিভাগের সুপারিনটেপ্ডিং ইগ্রিনীয়ার। ইরিগেশন বাংলোতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং আমাদের তরফ থেকে স্থানীয় প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে কথাবার্তা বলে গাড়ির ব্যবস্থাটি পাকা করে রেখেছিলেন। প্রতিরক্ষা দপ্তর শিলিগুড়ি থেকে আমাদের দুখানি শক্তিমান ট্রাক দিয়েছেন। সেই গাড়িতে করেই আজ ১৩ই মে আমরা শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক চলেছি। তেরোজন অভিযাত্রীর সঙ্গে তেরো তারিখটাও যুক্ত হল আজ।

কিন্তু ১৩ই যের কথা পরে হবে। আগে ১২ই মে অর্থাৎ গতকালের কথা শেষ করে নিই। গতকাল আমরা নির্দিষ্ট সময়ের দু-ঘণ্টা পরে শিলিগুড়ি পৌঁছেছি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি কামরূপ এক্সপ্রেসের পক্ষে দু-ঘন্টা লেট কিছুই নয়। পথে একমাত্র দার্জিলিং মেল সাধারণত ঠিক সময়ে আসে। কিন্তু আমরা সে ট্রেনে জায়গা পাই নি। ট্রেনেও রিজার্ভেশান পাওয়া মুশকিল হয়ে উঠেছিল কিন্তু ডেকার্স লেনের হিমালয়-প্রেমিক “ইউনাইটেড ট্র্যাভেল সার্ভিস” বহু চেষ্টায় আমাদের তেরোখানি বার্থ রিজার্ভ করে দিতে সমর্থ হয়েছেন।

ট্রেন দু-ঘণ্টা লেট হওয়ায় কোনো ক্ষতি হয় নি। গতকাল আমাদের শিলিগুড়িতে বিশ্রাম নেবার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্রাম হয় নি, কারণ তিনজন সারাদিন রেলে চড়েছে আর দশজন গভীর রাত পর্যন্ত তাদের জনা দুশ্চিন্তা করেছি। এটি একটি নৃতন অভিজ্ঞতা আর তা সঞ্চয় করেছি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে

রেলওয়ে বোর্ড আমাদের “সিঙ্গল ফেয়ার ডাবল জার্নি “হাফ পার্সেল রেট' কনসেশান দিয়েছেন। সাজ-সরঞ্াম, রেশন “প্রতিশন” অর্থাৎ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছাড়া বাকি সমস্ত মালপত্র আমরা “লাগেজ'-এ প্ৰুক' করে দিয়েছিলাম। শিলিগুড়িতে

গাড়ি থেকে নামার পরে শুনলাম-__লাগেজ'-এর কুলিরা বেলা দুটো পর্যন্ত ধর্মঘট করেছে, তারা ব্রেক্ভ্যান্‌ থেকে মালপত্র নামাবে না।

অতএব সদলবলে ছুটে এলাম অকুস্থলে। এসে দেখি তুমুল কাগণ্ড। ব্রেক্ভ্যানের খোলা দরজার সামনে ফেস্টুন বাঁধা। তারই সামনে দাঁড়িয়ে জন তিরিশেক লোক গ্লোগান দিচ্ছেন___ ইন্ক্লাব....জিন্দাবাদ, আমাদের দাবী...মানতে হবে। রেল বোর্ডের জুলুম...চলবে না চলবে না। আমাদের বিপ্রব... চলছে চলবে ইআদি ইত্যাদি।

এদের বিপ্লব চলতে দিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। এমনকি ব্রেক্ভ্যান্‌ থেকে এঁরা যদি আমাদের মাল নামিয়ে না দেন, তাহলেও আমরা অসন্তুষ্ট হব না। আমাদের শুধু প্রয়োজন কয়েক মিনিটের জন্য পতাকাটিকে দরজা থেকে খুলে নেওয়া।

সেই কথাই বলি জনৈক বিপ্রবীকে। তিনি জানান__আমাদের নেতাকে বলুন।

-তিনি কোথায়?

_ এই তো আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।

তাকিয়ে দেখি পায়জামা-পাঞ্জাবি-পরা জনৈক স্বাস্থ্যবান মাঝারী গড়নের যুবক। তাড়াতাড়ি তাকে নমস্কার করি। যুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুলি। কিন্তু কিছু বলতে পারার আগেই তিনি গন্ভীর স্বরে বলে ওঠেন_ আপনার বক্তব্য শুনেছি, সম্ভব লয়।

__মানে? আমি অপ্রস্তত।

নেতা প্রায় ধমক লাগান আমাকে_ এই সহজ কথাটার মানে বুঝতে পারছেন না? আমার লোক আপনাদের মাল নামাতে পারবে না।

হালে পানি পাই। তাড়াতাড়ি সবিনয়ে বলি-_আজ্মে আপনাদের নামিয়ে দিতে হবে না, আমরা নিজেরাই নামিয়ে নেব। আমরা শুধু আপনার অনুমতি চাই। আপনি বিশ্বাস করুন, আমরা বড় বিপদে পড়েছি। একটা পর্বতাভিযানে চলেছি, কাগজে নিশ্চয়ই পড়েছেন আমাদের কথা ভিক্ষে করে ভাড়া করে এই সব মালপত্র এনেছি। আগামীকাল সকালে আমাদের গ্াংটক রওনা হতে হবে। আমরা আপনাদের সহযোগিতা প্রার্থনা করছি।

এতক্ষণে নেতার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মৃদু হেসে তিনি বলেন- মুশকিল কি জানেন?

-_ আজ্ঞে...আবার বুঝতে পারি না তার কথা।

তবু এবারে তিনি আমাকে ধমক লাগান না। শুধু বলেন সহযোগিতা চাইছেন, কিন্ত আপনারা আমাদের সঙ্গে মানে খেটে খাওয়া গরীব মানুষদের সঙ্গে কিছুমাত্র সহযোগিতঅ করছেন না।

--আজ্ঞে করব। আপনাদের এই আন্দোলনের উদ্দেশ দাবীর কথা লিখে দিন, আমরা পরশুদিনের পত্রিকায় সব কথা প্রকাশ করে দেব। দেশের মানুষ - জানতে পারবেন আপনাদের এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা রেলওয়ে বোর্ডের নজর পড়বে আপনাদের দিকে। বিনিময়ে আপনি দয়া করে আমাদের মালগুলো ছেড়ে দিন।

প্রস্তাবটি নেতার বোধকরি অপছন্দ হয় না। তিনি বলেন- _যুশকিল কি জানেন,

আমার একার ইচ্ছায় আমি আপনাদের মাল নামিয়ে নেবার অনুমতি দিতে পারি না। আমাদের প্রেসিডেন্টের পারমিশান নিতে হবে।

_তিনি কোথায় ?

--এ যে ওখানে দাড়িয়ে আছেন। আপনারা দুজন আমার সঙ্গে আসুন।

অতএব আমি রমেন সম্পাদকের সঙ্গে সভাপতির কাছে আসি। ভদ্রলোকের পরনে সার্ট-প্যান্ট, হাতে ব্রীফকেসঃ চোখে কালো চশমা।

সবিনয়ে ভদ্রলোককে সব কথা বলি। তিনি একটুকাল চুপ করে থাকেন, তারপরে প্রশ্ন করেন কোন কাগজে ছাপাবেন আমাদের কথা?

রমেন তাড়াতাড়ি পত্রিকার নাম বলে ওঠেন।

_ হবে না। সভাপতি প্রায় গর্জে ওঠেন।

আমি বিন্মিত বিভ্রান্ত। কিন্তু ডঃ রমেন মজুমদার জার্নালিস্ট। পরিস্থিতিতে সামলে নেবার মতো বুদ্ধি অভিজ্ঞতা তার আছে। সুতরাং সে অকম্পিত স্বরে বলে-_আপনি তো জানেন যে আমাদের পত্রিকার বর্তমান সার্কুলেশন তিন লাখের ওপরে...

__জানি। সভাপতি তাকে শেষ করতে দেন না। বলেন- বুর্জোয়া পত্রিকাগুলোর সার্কুলেশন তাই হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা আপনাদের প্রস্তাবে রাজী নই।

_ কারণটা কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না।

- কারণ, সভাপতি ঘোষণা করেন_ _আপনার পত্রিকা আমার মালিকপক্ষের দালাল।

অতএব পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছে। শিলিগুড়ির ছেলেরা আমাদের নিয়ে এসেছে স্টেশন মাস্টারের কাছে। চমৎকার মানুষটি সমস্ত কাজ ফেলে তিনি ছুটে এসেছেন কুলিদের কাছে। হাতজোড় করে আমাদের মালগুলো ছেড়ে দেবার অনুরোধ করেছেন। কিন্ত গণতন্ত্রের প্রহ্রীদের প্রাণে সেই বুর্জোয়া আবেদন কোনো সাড়া জাগাতে পারে নি।

বার্থ হয়ে আমরা আবার ফিরে এসেছি স্টেশন মাস্টারের চেম্বারে। অনেক ভাবনা চিন্তার পরে তিনি বলেছেন-___ম্বাল উদ্ধারের জন্য এখন দুটি মাত্র পথ খোলা রয়েছে। একটি বল প্রয়োগ করে অর্থাৎ আর. পি. এফ.-এর সাহাযো জোর করে মাল নামানো। কিন্তু ওদের যা মনোভাব দেখলাম, তাতে একটা রক্তারক্তি হয়ে যাবে।

__আর দ্বিতীয় পথটি ? প্রশ্ন করি।

মাস্টার মশাই উত্তর দেন-__এদের এই আন্দোলন চলবে আজ বেলা দুটো পর্য্ত। আপনাদের জনদুয়েক সদস্য এই ট্রেনে করে চলে যান। আমি তাদের গার্ডের গাড়িতে বসিয়ে দিচ্ছি। বেলা দুটো বেজে যাবার পরে প্রথম যে স্টেশন আসবে, সেখানেই গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হবে, “স্টপেজ' না থাকলেও গাড়ি থামবে আপনারা মাল নামিয়ে নেবেন। লোক্যাল ট্রেনে করে রাতে এখানে চলে আসবেন। আমি কন্টোলকে বলে সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

শেষ পর্যস্ত সেই ব্যবস্থাই মেনে নিতে হয়েছে। অসিত বোস, অসিত মৈত্র বিনীত কামরূপ এক্সপ্রেসে আসামের পথে রওনা হয়ে গিয়েছে এবং রেল কর্তৃপক্ষের সাহায্যে রাত একটায় মাল নিয়ে ডাকবাংলোয় পৌঁছেছে।

না, শুধু রেল কর্তৃপক্ষের সাহাযই মাল নিয়ে নিরাপদে আসা সম্ভব হয় নি। শিলিগুড়ি সম্পর্কে মীদের কিছুমাত্র ধারণা আছে, তারা সবাই জানেন- নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পথটি সন্ধ্যার পরে মোটেই নিরাপদ নয়। ছিনতাই ডাকাতি লেগেই আছে। তাই শিলিগুড়ির নর্থবেঙ্বল এক্সপ্লোরারস ক্লাবের ছেলেরা আমাদের গতকাল স্টেশনে যেতে দেয় নি। তারাই দল বেঁধে নিউ জলপাইগুড়ি গিয়েছে। নিজেরাই ঘাড়ে করে মাল নিয়ে এসেছে স্টেশনের বাইরে তারপরে দশখানি রিক্সায় করে মালপত্র এবং অসিতবাবুদের নিয়ে এসেছে শিলিগুড়ি। আজ তারাই আমাদের গ্যাংটক রওনা করে দিয়েছে। তাছাড়া গতকাল শিলিগুড়ি “বাস ওনার্স এসোসিয়েশন” আমাদের “ডিনার খাইয়েছেন।

এবারে একটা দিন শিলিগুড়িতে কাটিয়ে আমরা একই সঙ্গে সহযোগিতা অসহযোগিতার যে নিদর্শন দেখে গেলাম, তা সত্যিই স্মরণীয়। সহযোগিতার কথা, বিশেষ করে শিলিগুড়ির যুবকদের সাহায্যের কথা, আমাদের বহুদিন মনে থাকবে।

যাক্‌ গে, যেকথা বলছিলাম প্রতিরক্ষা দপ্তরের দেওয়া দুখানি শক্তিমান" ট্রাকে করে আমরা এখন শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক চলেছি। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. চৌধুরীর সাহাযো এই গাড়ি দুখানি পাওয়া গেছে। ফেরার সময়ও এঁরা গাড়ি দেবেন। এতে আমাদের প্রায় হাজার দশেক টাকার সাশ্রয় হচ্ছে।

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক ১১৪ কিলোমিটার। প্রথম ১৯ কিলোমিটার অর্থাৎ সেবক পর্যন্ত আমরা পুবে এসেছি, তারপর থেকে চলেছি উত্তর-পূর্বে॥ মোটামুটি এই দিকেই পথ চলে আমরা গ্যাংটক পৌঁছব।

ংটক সিকিমের রাজধানী এবং প্রকৃতপক্ষে একমাত্র শহর। ক্রমবর্ধমান শৈল

শহর। উচ্চতা ৫১৮০০ ফুট। আয়তন আড়াই হাজার হেক্টর। জনসংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো। সিকিমের আর কোনো শহরে ভাল হোটেল-রেস্তরা কিংবা স্টেডিয়াম নেই। চীনের তিব্বত অধিকারের আগে গ্যাংটক ভারত-তিব্বত বাণিজ্যের একটি প্রধান সঙ্গম ছিল। আজও গ্যাংটকের একটি প্রধান ভাষা তিববতী। অপর তিনটি স্থানীয় ভাষা হল সিকিমী, লেপ্চা নেপালী। হিন্দীও প্রায় সকলেই বুঝতে পারেন। তবে ইংরেজী অথবা বাংলা জানলেও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।

মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্যাংটকে পর্যটকদের খতু। সিকিম ন্যাশনালাইজড়্‌ ট্রা্সপোর্ট, শিলিগুড়ি দার্জিলিং ক্যালিম্পং থেকে গ্াাংটকে নিয়মিত বাস চালান। উত্তরবঙ্গ পরিবহনের বাসও গ্যাংটকে যাতায়াত করে।

গ্যাংটকের প্রধান দর্শনীয় স্থান সরকারী কুটিরশিল্প বিদ্যালয়, রাজ পরিবারের মন্দির, ডীয়ার (হরিণ) পার্ক, তিববতীয় গবেষণা বিদ্যালয়, অর্কিড স্যাংকচুয়ারী এবং রাজপ্রাসাদ।

গ্যাংটকের ভাবনা থেমে যায়। গাড়ি থেমেছে। ইতিমধো আমরা কালিঝোরা বিরিক পেরিয়ে এসেছি। এবারে গাড়ি থেমেছে তিস্তা বাজারে তার মানে শিলিগুড়ি থেকে ৫৩ কিলোমিটার এসেছি। পথের ভানদিকে অনেকটা নিচে তিস্তা নদী। এই তিস্তার উৎসে চলেছি আমরা।

সামনে ডানদিকে পুল। এঁ পুল পেরিয়ে ওপারে গিয়ে ডানদিকে কালিম্পঙের পথ আর বাঁদিকে গ্যাংটকের। কিন্তু আপাতত পুল পার হওয়া নিষেধ। কারণ রাজাপাল ক্যালিম্পং যাচ্ছেন। তাই পুলের দু-পারেই গাড়ির মিছিল।

সকালের চা-সিঙাড়া বহুক্ষণ হজম হয়ে গিয়েছে। দল বেঁধে নেমে আসি গাড়ি থেকে। চা পকোরা খেয়ে আবার উঠে আসি গাড়িতে রাজাপালের পথ চেয়ে বসে থাকি।

“আচ্ছা, আপনারা কি সিনিয়লচু অভিযানে যাচ্ছেন ?”

তাকিয়ে দেখি সাদা টুপি মাথায় একটি ছিপছিপে তরুণ পথে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে। উত্তর দিই, “হ্যা।”

ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করে, “আপনারা আজ গ্যাংটকে থাকবেন?”

“হ্া।+?

“আচ্ছা, আপনাদের সঙ্গে শন্কু মহারাজ আছেন কি?”

এবারে আমাকে নীরব হতে হয়। মৃদু হেসে হিমাদ্রির দিকে তাকাই। হিমাদ্রিও একটু হাসে সে বলে, “আপনি যাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, তিনিই শঙ্কু মহারাজ ।”

ছেলেটি বলে, “দাদা, আপনার মনে আছে কিনা জানি না। আমার নাম কমল চৌধুরী। আমি আপনার প্ধু-বৃন্দাবনে” পড়ে আপনাকে একখানি চিঠি লিখেছিলাম, আপনি উত্তরও দিয়েছিলেন।”

কথাটা মনে থাকা সম্ভব নয়, কিন্তু আমি ভাবি অনা কথা। বন্ধু দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায় গ্যাংটক বেড়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের এই অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি একদিন বললেন- গ্যাংটকে যদি আপনাদের কোনো সাহাযোর দরকার হয় তাহলে টেলিফোনের এস. ডি. ও. এস. এস. সেন এবং হাইকোর্টের একাউল্ট্যান্ট কমল চৌধুরীকে দুখানি চিঠি লিখুন। ওরা নিশ্চয়ই আপনাদের সাহাযা করবেন।

আমি চিঠি লিখেছিলাম। মিঃ সেন যথাসময়ে উত্তর দিয়ে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্ররতি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন তিনি নাকি আমার পরিচিত। কিন্তু কমল চৌধুরী চিঠির উত্তর দেন নি। এই কি সেই কমল টৌোধুরী?

ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করি, “আপনি গ্যাংটকে থাকেন 2?”

“আজ্ঞে হা। আমি হাইকোর্টে চাকরি করি।”

তাহলে তো আমার অনুষান মিথ্যে নয়॥। এবারে বলি চিঠির কথা। কমল জানায়, “মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমি বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। বহু চেষ্টা করেও মাকে ধরে রাখতে পারলাম না। শ্রাদ্ধ-শাস্তি মিটে যাবার পরে এই আড়াই মাস পর গ্যাংটকে ফিরছি। আজ গ্যাংটক পৌঁছে বোধ হয় আপনার চিঠি পাবো।”

পুলিশের বাঁশি সরব হয়ে উঠেছে। তার মানে রাজ্যপাল এলেন বোধ হয়। কমল বলে, “দাদা, আপনাদের গাড়িতে অনেক জায়গা, আমি কি বাস থেকে ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে চলে আসব ?”

“নিশ্চয়ই” অমূল্য বলে, “আপনাকে যে আমাদেরও দরকার ।”

কমল ছুটে চলে যায় তার বাসের দিকে। রাজাপাল তার দলবল নিয়ে নিষ্বাস্ত জন রয়ে তি রহ জা নুডিনহা রা আর ব্যাগ নিয়ে এসে গেল।

১৩

গাড়িতে উঠে এসেই সে বলে, “আমার একটা অনুরোধ আপনাদের রাখতে হবে দাদা!”

“বেশ বলুন!”

“আপনারা যারা আমার থেকে বয়সে বড়, তারা দয়া করে আমাকে তুমি" বলবেন।”

আমরা কমলের দাবী মেনে নিই। গাড়ি তিস্তার পুল পেরিয়ে আসে। এখনও আমরা সিকিমে প্রবেশ করি নি। পশ্চিমবঙ্গে রয়েছি। তবে ১৮৫০ শ্রীষ্টাব্দের আগে এই অঞ্চল সিকিমের অন্তর্গত ছিল। তৎকালীন সিকিমের দেওয়ান নামগুয়ের গোয়ার্তুমির খেশারত স্বরূপ সিকিমকে এই অঞ্চল হারাতে হয়েছে। মনে মনে সেই সব কথাই ভাবতে থাকি। ইতিহাসের কথা- __সিকিমের ইতিহাস। আমি যে আজ সিকিমে চলেছি।

লেপ্চারা হচ্ছেন সিকিমের আদিবাসী। কিন্তু আজও তারা নিজেদের 'রং-পা' (0.০7-7১9) অর্থাৎ গিরিসন্কটের বাসিন্দা বলে থাকেন। তারা সম্ভবতঃ পুবিক অর্থাৎ আসামের দিক থেকে এদেশে আসেন তাই তাদের সঙ্গে তিববতীদের আকারগত মিল নেই। অনেকের ধারণা দ্বীষ্টিয় অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে এই অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তারা তখন যে সমস্ত দূর-দুর্গম উপত্যকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন, তার অনেকাংশ এখনও আমাদের কাছে অপরিচিত বলা চলে।

প্রায় পাঁচ শ"' বছব ধরে লেপ্চারা কাঞ্চনজঙ্ঘা উপত্যকার চারিদিকে বসবাস করেন। ১২৬৮ খ্রীষ্টাব্দে খেই-বুম্সা (079৩ 1397752) নামে তিব্বতের খাম্‌ (00) রাজপরিবারের একজন রাজপুত্র তীর্ঘদর্শনে সিকিমে আসেন। তার সঙ্গে লেপ্চা সর্দার থেকংটেকের (৭1701075110 খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তিনি আর দেশে ফিরে যান নি। থেকংটেকের মৃত্যুর পরে খেই-বুম্সার ছেলে লেপ্চাদের সর্দার হন। তারই

ংশধরগণ প্রায় সাত শ' বছব সিকিমের সিংহাসনে রাজত্ব করেছেন।

সেকালে লেপচারা চীদের উপাসক ছিলেন। তারপরে ১৬৪১ খ্রীষ্টাব্দে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য লামারা তিববত থেকে সিকিমে আসেন। তারাই বুম্সার জনৈক বংশধরকে চোগিয়াল উপাধিতে ভূষিত করে সিকিমের সিংহাসনে আসীন করে দেন।

পরবর্তীকালে ভুটিয়ারা সিকিমে এসে বসবাস শুরু করেন। তারাও লেপচাদের মতো মঙ্গোলীয় এবং চাঁদের উপাসক। হয়েছে। তখন সিকিমের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। চোগিয়াল নেপালের রাজার সঙ্গে সন্ধি করে তার মেয়েকে বিয়ে করেন। নেপালী রানী স্বামীর রাজা দেখে খুব খুশী হলেন। বললেন-_আমি তোমার রাজোর নাম রাখব “সু-হিম” মানে সুখের ঘর। সিকিম নামটি সেই সু-হিম শব্দের অপভ্রংশ। সিকিম শব্দটিও নেপালী। অর্থ নূতন রাজ্য।

১৭১৬ স্রীষ্টাব্দে তৃতীয় চোগিয়ালের মৃত্যুর পরে ভুটান নেপাল সিকিম আক্রমণ করে। এবং এক শ"' বছর ধরে সিকিমকে সেই গীমাস্ত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতে হয়।

১৮১৫ সালে চোগিয়ালের অনুরোধে বৃটিশরা সিকিমের সাহাযষো এশিয়ে আসেন এবং তারা অনায়াসে ভূটানী নেপালীদের সিকিম থেকে তাড়িয়ে দেন। এই

৯১

অভিযানের নেতৃত্ব করেন মালদহের কমার্সিয়াল রেসিডেন্টু জে. ডাব্লু, গ্রান বৃটিশ সেনাপতি জি. ডাব্লু, এ. লয়েড। অভিযানকালে একটি পাহাড়ী গ্রাম দেখে তাদের বড়ই পছন্দ হয়। গ্রামটির অবস্থান যেমন সুন্দর, তেমনি অপরূপ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তারা গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিষ্কের কাছে আবেদন করলেন___সিকিমের মহারাজার কাছ থেকে এই গ্রামটি চেয়ে নিতে পারলে বড়ই ভাল হয়। ভবিষ্যতে সীমস্তরক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য অসুস্থ সৈন্যদের স্বাস্থাবাসরূপে গ্রামটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

বেন্টিষ্ক তাদের অনুরোধ অনুমোদন করলেন। বৃটিশ সরকার অন্য কোনো সীমান্তবর্তী গ্রামের সঙ্গে বিনিময় করতে কিংবা টাকা দিয়ে কিনতে চাইলেন এঁ গ্রামটি প্রথমে সিকিমের মহারাজা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেন, কিন্ত পরে রাজারক্ষায় বৃটিশ সাহাযা অপরিহার্য বুঝতে পেরে গ্রামটি দিতে সম্মত হলেন। ১৯৩৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী একটি দানপত্র (01£71-0৩4) করে সিকিমের মহারাজা গ্রামটি বৃটিশ সরকারকে দিয়ে দিলেন। দানপত্রে গ্রামটির চৌহদ্দি সম্পর্কে লেখা হয়-__

4৯11 075 19180 5040) 0 00) 0168. 12110০০1 11৩1, 585 01 139125111), 1521)11 2৫14 00৩ 11015 7২2115০111৬], ৫110 ৬/০51 0 চ₹1111170, 8170 [৬1917211841 17৬০15.”

এই গ্রামটির জন্য ১৮১৪ সাল থেকে বৃটিশরা সিকিমকে বার্ধিক তিন হাজার টাকা খাজনা দিতে শুরু করেন। ১৮৪৬ সালে তারা সেই খাজনার পরিমাণ ছ' হাজার টাকায় বৃদ্ধি করেন। সেদিনের সেই পাহাড়ী গ্রামটি, আজকের দার্জিলিং__হিমালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শৈলাবাস।

বৃটিশরা কিন্ত সিকিমের মহারাজাকে বেশিদিন খাজনা দেন নি। সিকিমের অবিমৃয্যকারী দেওয়ান নামগুয়ে নিজেই তাদের এই খাজনা বন্ধ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। এবং সেই সঙ্গে সিকিমকে এই অঞ্চলটিও হারাতে হয়েছে। আর তা ঘটে মাত্র তিন বছর পরে ১৮৪৯ সালের ৭ই নভেম্বর।

সিকিম-হিমালয়ের উত্ভিদসম্পদের কথা শুনে স্যার জোসেফ হুকার নামে জনৈক উদ্তিদ্তত্ববিদ বৃটেন থেকে সরকারী বৃত্তি নিয়ে ১৮৪৮ সালে সিকিমে এলেন। তিনি ছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহাউসীর বন্ধু। সুতরাং সিকিমে ভ্রমণ উদ্ভিদ-সীক্ষা করবার জন্য সিকিম দরবারের অনুমতি পেতে তার কোন অসুবিধে হয় নি। ১৫ই ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গালি-লা গিরিশিরার ইসুন্বো গিরিপথ পেরিয়ে নেপাল থেকে সিকিমে প্রবেশ করেন। ইয়াক্সাম, পেমিওংচি হয়ে তিস্তার উপকূলে অবস্থানরত দার্জিলিঙের সুপারিন্টেনডেন্ট ডঃ ক্যান্বেলের সঙ্গে মিলিত হন। হাতে সময় থাকায় ক্যান্বেলও হুকারের সহ্যাত্রী হলেন। তারা তাশীডিং পেখিওংচিসহ উত্তর-পশ্চিম সিকিম ভ্রমণ করেন। ইতিমধ্যে সিকিমের দেওয়ান বদল হয়েছে। প্রাক্তন দেওয়ানের মৃত্যুর পরে রাজমহিষীর তিববতবাসী ধূর্ত ভাই নামগুয়ে নূতন দেওয়ান হয়েছেন। তিনি বৃটিশদের পছন্দ করতেন না।

হুকার সংবাদটি জেনেও চুংথাং হয়ে জেমু হিমবাহ সমীক্ষা করলেন। সেপ্টেম্বর মাসে ডোঙকিয়া হিমবাহ ভ্রমণ করে পূর্ব-সিকিমে গেলেন। তার ইচ্ছে ছিল পূর্ব-সিকিম

৯৭

সনীক্ষা শেষ করে চো-লা (১৪,৫০০) ইয়াক্‌-লা (১৪,৪০০) পেরিয়ে তিব্বতের চুন্বি উপত্যকায় চলে যাবেন। কিন্তু পথে সিঙটাম্‌ তহশিলের চামান্যাকো (১২১৫০০') রেস্টহাউসের সামনে সিকিমের সেপাইরা তাদের বন্দী করে। সিকিম দরবারের অনুমতিপত্র থাকা সত্বেও দেওয়ানের আদেশে সেপাইরা তাদের প্রচণ্ড প্রহার করে সেই ঠাণ্ডায় সারারাত বাইরে বেঁধে রাখে তারপর তাদের সিঙটামে নিয়ে আসা হয়। সেখানে এই সম্মানিত অতিথিদের আরেকবার মারধোর করে রাজধানীতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। *

বারো দিন বাদে অর্থাৎ ১৮ই নভেম্বর (১৮৪৯) তারিখে তাদের মালবাহক সহকারীদের মুক্তি দেওয়া হয়। হুকার তাদের হাত দিয়ে গোপনে লর্ড ডালহাউসীর কাছে একখানি চিঠি পাঠান।

চিঠি পেয়েই লর্ড ডালহাউসী কলকাতা থেকে দার্জিলিঙে সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে তিনি সিকিমের দেওয়ানকে অতান্ত কঠোর ভাষায় এক চরমপত্র পাঠান। বলেন__ডাঃ ক্যান্বেল স্যার জে. ডি. হুকারের ওপর আর কোন অত্যাচার হলে বৃটিশরা সমস্ত সিকিম দখল করে নেবেন।

খবরটা সিকিমের মহারাজার কানে আসে তিনি শালাবাবুর (দেওয়ান) এই অবিষৃষাকারিতার পরিণাম অনুমান করতে পারেন। তবু শালাবাবুর জনা ক্যান্থেল হুকারকে মুক্তি দিতে তার বেশ কয়েকদিন কেটে যায়। ২৩শে ডিসেম্বর তারা দার্জিলিঙে ফিরে আসেন।

ততদিনে যা হবার হয়ে গিয়েছে। বৃটিশসৈন্য বিনা বাধায় দার্জিলিঙের তরাই এবং মোরাঙের পাহান্ড়ী অঞ্চল দখল করে নিয়েছে সেই সঙ্গে বৃটিশরা ছ'হাজার টাকার খাজনাও বন্ধ করে দেন। দার্জিলিং কালিম্পং বৃটিশ-ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়। এখন অবশ্য এসব কথা শুধুই অতীতের ইতিহাস। কারণ এখন সারা সিকিমই স্বাধীন ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবং সিকিমবাসীরা সবাই ভারতীয়।

দুই

আমার বহু বছরের বাসনা পূর্ণ হল। সিকিমের মাটি স্পর্শ করলাম। আমরা রংপো পৌঁছলাম অর্থাৎ শিলিগুড়ি থেকে ৭৫ কিলোমিটার আসা গেল। এটি তিস্তা উপত্যকায় সিকিমের সীমান্ত শহর। পথের পাশে মদের একখানি সুবিরাট বিজ্ঞাপন সিকিমের মাটিতে আমাদের প্রথম স্বাগত জানালো ঘীরেন মানে আমাদের সহকারী নেতা সুলেখক বীরেন্দ্রনাথ সরকার সহাসো বলে, “খুবই স্বাভাবিক। সিকিমের মানুষ যে মদ স্বড়ই ভালোবাসেন এবং বিখ্যাত সিকিম ডিস্টিলারি এখানেই অবস্থিত।” গাড়ি থেকে নেমে আসি। সামনেই অন্নপূর্ণা হোটেল- বাঙালীর প্রতিষ্ঠান।

* 1100513 41110081998) 3017181" 1 ধীরেন্দ্রনাথ সরকারের “সিকিম' বইখানি ভ্রষ্টব্য।

১৩

একতলায় রেস্তোরা, দু-তলায় থাকার ঘর। ভাত-ডাল যিষ্টিসহ বিবিধ খাবার পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের হাতে একদম সময় নেই। বেলা একটা বাজে। এখনও ৩৯ কিলোমিটার পথ বাকি। বড় গাড়ি, চড়াই পথ-_কম করেও আড়াই ঘন্টা সময় লাগবে। অফিস ছুটি হয়ে যাবার আগে গ্যাংটকে পৌঁছনো দরকার। আজই ইনারলাইন ক্যামেরা পারমিট যোগাড় না করতে পারলে, কালকের দিনটি গ্যাংটকে বসে থাকতে হবে। নষ্ট হবে একটি অমূল্য দিন আর বেশ কিছু টাকা। তাই চা-বিস্কুট খেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে আসি গাড়িতে গাড়ি এগিয়ে চলে।

ছোট শহর রংপো। বাড়ি-ঘর প্রায় সবই একতলা ঘরই বেশি। ঘরের চালগুলো প্যাগোডা গড়নের, ভারী সুন্দর। বীরেন বলে, “এটা সিকিমের নিজস্ব নির্যাণ-কৌশল।”

পথগুলিও বড় সুন্দর- _আকার্বাকা মসৃণ ছায়াশীতল। সুন্দরের অভিসারে এসেছি। প্রথম দর্শনেই সুন্দরী সিকিমকে ভালোবেসে ফেললাম।

তিস্তার তীরে তীরে পথ চলেছি। তিস্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শৈশবের জ্ঞানলাভের পরে প্রথম যাকে নদী বলে চিনেছিলাম, তার নাম তিস্তা। শৈশবের সেই খেলাঘর রহমতপুর গীয়ে যাবার আমার এখন অধিকার নেই। সেদিনের খেলার সামী আনোয়ার আর আমিনাও এখন আমাকে চিনতে পারবে না। আমি আজ তাদের কাছে বিদেশী।

তবু আমি আজ্ম সেই তিস্তার তীরে তীরে পথ চলেছি। আমার এক মস্ত সান্ত্বনা। ছোটবেলায় কতদিন তার তীরে বসে আচার্য জর্গদীশচন্দ্রের মতই প্রশ্ন করেছি__তিস্তা, তুমি কোথা থেকে এসেছো?

সে প্রশ্নের উত্তর পাই নি। জগদীশচন্দ্রের মতো তিস্তার উৎস সন্ধানের কথা তখনও বালকমনের ভাবনায় আসে নি। অথচ আমি আজ সতাই তার উৎস দর্শনে চলেছি। হোক না জীবনের মধ্যাহ্ু, তবু তো শৈশবসাথীর জন্মভূমি দর্শন করতে পারব! আমি ভাগ্যবান।

পাহাড়ের গা দিয়ে বনময় উত্রাই পথ দিয়ে আমরা সিঙটাম পৌঁছিলাম। পথটা এখানে অনেকখানি সমতল পথের দু-পাশে দোকান-পাট, পেট্রোল পাম্প, থানা, পোস্ট অফিস এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। শুনিছি এখানে খুব কমলালেবু হয়॥। আমরা শিলিগুড়ি থেকে ৮৫ কিলোমিটার এসেছি।

চেক পোস্টের ঝামেলা মিটবার পরে আবার গাড়ি চলল এগিয়ে। এবারে চড়াই পথ। পথের পাশে সেই তিস্তা-_-আমার শৈশবসাধী তিস্তা।

সিঙটাম থেকে ১৭ কিলোমিটার এগিয়ে রাণীপুল- ছোট জনপদ। তারপরে ১২ কিলোমিটার চড়াই ভেঙে গ্যাংটক। বেলা সাড়ে তিনটের সময় আমরা গ্যাংটক পৌঁছলাম।

মিঃ সেন আমাদের আশ্রয়ের ব্যবহা করে রেখেছেন। তাই অসিত, কেশব কমলকে নিয়ে অমূল্য টেলিফোন এক্সচেঞ্রে ছুটল। মিঃ সেন এখানে টেলিফোনের এস. ডি, ও.

একটু বাদে অমুল্যরা একটা ট্যার্সিতে ফিরে আসে। অমূল্য বলে, “তোমরা টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে যাও। সেনদা ওখানে দীড়িয়ে রয়েছেন। পাশেই শান্তিভবন। সেখানেই আমরা রাতে থাকব। তিনতলায় থাকতে হবে। কাজেই মালপত্র গাড়িতেই থাকবে শুধু রুক্স্যাক প্লীপিং ব্যাগ ওপরে নিয়ে যেও।

১৯৪

রাতে ড্রাইভারদের সঙ্গে হ্যাপ্রাও গাড়িতে ঘুমোবে। আমরা গুলিস অফিসে যাচ্ছি। তোমরা সবাই হোটেলে খেয়ে নিও।”

অসিত নেমে আসে ট্যাক্সি থেকে। অমূল্য সুশান্তবাবুকে ট্যার্সিতে তুলে নেয়, সে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে বলে।

জায়গাটা খুবই কাছে। তাই আমি অসিত আর গাড়িতে উঠি না। গাড়ির পেছনে হেঁটে চলি শাস্তিভবনের দিকে।

বাক ফিরতেই বাঁদিকে টেলিফোন এক্সচেঞ্ু। তারই সামনে আমাদের গাড়ি থেমেছে। সদস্যরা নেমে পড়েছে। মাল-পত্র নামছে।

কিন্ত ওখানে ভদ্রলোক কে? যে অসিতবাবু বীরেনের সঙ্গে কথা বলছেন! খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে! কোথায় দেখেছি?

হ্যা মনে পড়েছে। সুধেন্দুশেখরবাবু আমার খুড়তুতো ভাই দেবতোষের স্ত্রী মালার বড়দা। ওদের বিয়ের সময় আলাপ হয়েছে, নানা কথা হয়েছে।

হা, তিনি তো এখানেই থাকেন___এই গ্যাংটকে। আমাকে বেড়াতে আসতেও বলেছিলেন। আসা হয় নি। যাক্‌ গে, ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই হল। সাহাযা পাওয়া যাবে। কিন্তু বীরেন আর অসিতবাবু সুধেন্দুবাবুকে চিনল কেমন করে? বেশ জমিয়ে গল্প করছে মনে হচ্ছে। কি জানি, হয়তো বাঙালী পেয়ে, বাংলার সদ্ধযবহার করে নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের 4/951-077-119901। মিঃ সেন কোথায়? তিনি নাকি এখানেই দীড়িয়ে আছেন। সেই কথাই জিজ্ঞেস করি অসিতকে।

অসিত যেন অবাক হয়। বলে, “সে কি! আপনি সেনদাকে চিনতে পারছেন না, অথচ সেনদা যে বললেন, আপনি তাকে চেনেন! তো তিনি কথা বলছেন ববীরেনদা আর অসিতদার সঙ্গে।”

“উনিই সেনদা!” আমি বিজ্রান্ত।

“হা।” অসিত উত্তর দেয়।

এবারে মনে পড়ে আমার___দেবতোষের শ্বশুরবংশ তো সেন। সুধেন্দুশেখর সেন যে এস. এস. সেন কিংবা সেনদা হতেই পারেন। আর তাই আমাদের চিঠির উত্তরে জানিয়েছিলেন_ তিনি আমার পরিচিত।

পরিচিত বৈকি, সিকিমের সবচেয়ে উপকারী মানুষটি আমার পরিচিত, আমার আম্ত্রীয়।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে তার কাছে আসি। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন।

আলিঙ্গনযুক্ত হয়ে বলি, “দেবতোষের বিয়ের সময় নেমন্তন্ন করেছিলেন, দেখুন ঠিক এসে গিয়েছি।”

“এসেছেন, খুবই খুশী হয়েছি। কিন্ত আসা তো আমার নেমস্তন্নে নয়।” সেনদা সহাসো বলেন।

প্রশ্ন করি, “তাহলে কার নেমস্তর রক্ষা করতে এসেছি?”

“সিনিয়লচুর।”

সবাই হেসে উঠি। তারপরেই মনে হয়। তিনি ঠিকই বলেছেন। সিনিয়লচুর আহ্বানে আমরা আজ গ্যাংটকে এসেছি, সুন্দরের অভিসারে চলেছি। কিন্তু সিনিয়লচু কি সেনদার মতো উফ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করবে আমাদের ?

বড় রাস্তার ওপরেই শান্তিভবন-মন্দির আরিথি নিবাস। দুখানি বড় বড় ঘর পাওয়া গিয়েছে। মেঝেতে মোটা গদি পাতা রয়েছে। তার ওপরে গ্লীপিং ব্যাগ পেতে শুয়ে পড়া যাবে। এয়ার-ম্যাট্রেস ফোলাবার প্রয়োজন পড়বে না। পাশেই গুটিতিনেক করে শৌচাগার স্নানাগার।

ঘর গুছিয়ে নেষে আসি নিচে। আর তখুনি দেখা হয়ে যায় দীপালির সঙ্গে বাংলার প্রথম মহিলা পর্বতাভিযানের (রোন্টি__-১৯১৮৯৩) সফলকাম নেত্রী। শুনেছিলাম সে গ্যাংটকে স্বামীর ঘর করছে এবং একটা স্কুলে শিক্ষকতা করছে। শুধু দীপালি নয়, সঙ্গে তার স্বামী ছেলে রয়েছে। সত্যি বড় ভাল লাগল। হিমালয়ের মেয়ে হিমালয়ে এসে বাসা বেঁধেছে। ওরা সুখী হোক।

ওদের সঙ্গে গল্প করতে করতে এগিয়ে চলি বাজারের দিকে আমরা খেতে চলেছি। দরীপালি বলে, “অমুল্যদারা ফিরে এলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে বলবেন। এখানে কিন্তু রাত আটটার মধ্যে সব খাবারের দোকান বন্ধ হয়ে যায়।”

“কেন এখানেও কি লোড শেডিং আছে নাকি?

“না ।” 'দীপালি বলে, “পাছে মাতালরা এসে ঝামেলা করে, তাই কেউ বেশি রাত পর্যন্ত দোকান খুলে রাখতে সাহস পান না।”

“এখানে সবাই বুঝি খুব মদ খায় 2”

“তা আর বলতে। একে ঠাণ্ডা জায়গা, তার ওপরে এক্সাইজ ডিউটি কম হওয়ায় মদ এখানে বেশ সত্তা। স্থানীয়রা অবশ্য দিশী পদ্ধতিতে তৈরি মদই বেশি খেয়ে থাকেন।”

সত্যি বড় দুঃখের কথা। মদ খাওয়া কোন অপরাধ নয়। সুরা বিশ্বের প্রাচিনতম পানীয়। মদ মানুযেই খায়। কিন্তু বিপদ হয় যখন মদ মানুষকে খায় আর তখনই যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যায়। উপজাতিদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য আমরা এত আইন পাশ করেছি কিন্তু তাদের বোঝাবার চেষ্টা করছি না যে মানুষ মদ না খেলেও বেঁচে থাকতে পারে এবং বেশি মদ খেলে মনুয্যত লাঞ্ছিত হয়।

সারাদিন খাওয়া হয় নি, তাই বোধহয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলি। দীপালিরা বসে বসে খাওয়া দেখে তারপরে বিদায় নেয়। বিদায় বেলায় দ্রীপালি বলে, “অমুলাদাকে বলবেন আমাকে ফোন করতে আর ফেরার পথে আপনাদের সবার ডিনারের নেমন্তন্ন রইল আমার বাসায়। কবে আসছেন আগে জানাবেন কিন্তু।”

“তা না হয় জানালাম,” অসিতবাবু সহাস্যে বলে, “কিন্ত একে তো আমরা তেরোজন, তার ওপরে পাহাড়ে যাবার সময়েই তো খাবার নমুনা দেখলে, ফেরার পথের পরিমাণটা অনুমান করতে পারছ নিশ্চয়”

“পারছি বৈকি,” দীপালি মৃদু হাসে। বলে, “তবু নেমন্তন্ন রইল।”

“অবশ্যই রক্ষা করব।” সমস্বরে সবাই বলে উঠি।

“ধন্যবাদ 1

ওদের স্কুটার চলতে শুরু করে।

ফিরে আসি ঠাক্রবাড়িতে। সংক্ষেপে সবাই শাস্তিভবনকে ঠাকুরবাড়ি বলেন। এসে দেখি অমুল্যরা এসে গিয়েছে।

অযূল্য বলে, “কাজ হয় নি, তবে খানিকটা এগিয়েছে। সেনদা ফোন করে

১৬

দিয়েছিলেন, আমরা দেখা করেছি আই. জি. মিঃ গ্যাডগিলের সঙ্গে 1....৮

“চমতকার লোক”, সুশাস্তবাবু মাঝখান থেকে বলেন, “মারাঠী হয়েও বাংলাতেই কথাবার্তা বললেন। তার স্ত্রী শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, শুনেছি খুব ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন।”

অমুলা পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসে। বলে, “আমরা “ক্যামেরা* পারমিটের দরখাস্ত করে “ইনারলাইন” পাসপোর্টের ফর্ম নিয়ে এসেছি। ফর্মগুলো লিখে সবাইকে দিয়ে সই করিয়ে কাল সকাল দশটায় পুলিস অফিসে জমা দিতে হবে ।”

“তার মানে পাসপোর্ট পেতে কাল সারাদিন কেটে যাবে ।” অসিতবাবু বলে ওঠে।

কেশব আপত্তি করে, “না আই. জি. সাহেব নিজে ফোন করে দুজন অফিসারকেই বলে দিয়েছেন, আগামীকাল বেলা এগারোটার মধো যেন আমাদের পারমিট পাসপোর্ট দিয়ে দেওয়া হয়।”

“সুশান্তদা, অসিতদা কেশবকে নিয়ে আমি সকাল আটটায় আর্মি হেড কোয়াটার্সে চলে যাবো, তোমরা বাজার সেরে ঠিক দশটায় পুলিস অফিসে যাবে। এবং আশা করছি আমরা বেলা বারোটা নাগাদ চুংখাং রওনা হতে পারব।”

“তবে ক্যামেরা পারমিট কিন্তু “কন্ডিশন্যাল” হবে ।” সুশান্তবাবু বলে ওঠেন।

“কি রকম ?” বুঝতে পারি না তার কথা।

অমূল্য বুঝিয়ে দেয়, “আমরা দরখাস্তে আমাদের সবকণ্ট ক্যামেরা ফিল্মের “ডিটেল্স” দিয়ে এসেছি। ফেরার পথে “এক্সপোজড, ফিল্মগুলো চুংথাং চেক্‌পোস্টে জমা দিয়ে আসতে হবে। তারা সেগুলো এখানে পাঠাবেন। এখান থেকে ফিল্মগুলো দিল্লি যাবে, ডিফেন্স ল্যাবরেটরীতে “ডেভেলপ্ড” হবে। মিলিটারী ইনটেলিজেন্স ছবিগুলো পরীক্ষা করে আমাদের ফেরত দেবেন।

“তার বোধকরি আর দরকার পড়বে না।”

“একথা কেন বলছেন দাদা?” কমল আমার দিকে তাকায়।

ওকে বলি, “তুমি নিশ্চয়ই শুনেছো, আমরা এই অভিযানের একটা “সিক্সটিন মিলিমিটার কালারড মুভি” তুলব বলে সুশাস্তবাবুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এই চলচ্চিত্র প্রযোজনা করতে আমাদের প্রায় দশ হাজার টাকা খরচ পড়বে সেই ফিল্মের কি গতি হতে চলেছে, তা তো শুনলে। আমরা যেসব ফিল্ম কিনে এনেছি, সেগুলো ডেভেলপ্‌ করাবার জন্য বন্বে হংকং জর্মানীতে পাঠাবার কথা। দিল্লীর ডিফেন্স ল্যাবরেটরীর পক্ষে ফিল্ম ডেভেলপ্‌ করা সম্ভব নয়। সুতরাং সুশাস্তবাবুর সকল শ্রম এই দরিদ্র অভিযানের কয়েক হাজার টাকা যে সমূলে নষ্ট হবে, সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করার কোন অবকাশ নেই।”

“তুমি চিন্তা করো না শঙ্কুদা!” অমূল্য আমাকে আশ্বস্ত করে তুলতে চায়। বলে, “আমরা এখন এই কন্ডিশন্যাল পারমিট নিয়েই চলে যাবো। তবে কোন ০০০০৫ 117) ওদের হাতে দেব না। কি ভাবে কি করব, তা তখন ভেবে দেখা যাবে।”

কথাটা খারাপ বলে নি অমূল্য, এখন নিয়ে দরবার করতে হলে এখানে দেরি হয়ে যাবে। আই, জি. ভাল লোক, যা করার ফেরার সময় করা যাবে।

হিমালয় (৩য়)-২ ১৭

তাই ওকে বলি, “এবারে তোরা খেয়ে আয়। কমলকে সঙ্গে নিয়ে যা] ফিরে এলে সেনদার বাড়িতে যাবো ।”

কমলই সেনদার বাড়িতে নিয়ে আসে আমাদের। বেচারী আড়াই মাস পরে গ্যাংটক এসেছে, এখন পর্যস্ত ঘরে যায় নি। মালপত্র আমাদের গাড়িতে রেখে সেই থেকে অমূলার সঙ্গে ঘুরছে। ওকে পেয়ে খুবই সুবিধে হয়েছে। অপরিচিত জায়গা তবু আমাদের সময় নষ্ট হয় নি। কিন্তু কমল এখানে একা থাকে, এতদিন ওর ঘর বন্ধ রয়েছে, এবারে ওকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। একটু আগে সেই কথাই বলেছিলাম ওকে। সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছে__ঘর-দোর ঠিক করার অনেক সময় পাবো দাদা, কিন্তু আপনাদের সঙ্গলাভের সুযোগ যে আর পাবো না। কালই তো আপনারা চলে যাচ্ছেন।

সেনদার বাড়িতে এসে পরিচয় হল তার তিন ছেলের সঙ্গে। বড় দুই ছেলে এখানেই থাকে, চাকরি করে। সেজ ছেলে কলকাতায় থাকে, ছুটিতে বাবার কাছে এসেছে। বৌদি ছোট তিন ছেলে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কলকাতাতেই থাকেন। মেয়েটি ছোট, স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে সুপ্রকাশ বিয়ে করেছে, তার স্ত্রী নিথ্ধা এখানে গৃহকন্ত্রী। বয়সে তরুণী হলেও পাকা গিনী। খুবই কাজের মেয়ে। তিনজন মানুষ অফিস করে, তার ওপর সেনদার সমাজসেবার কল্যাণে দৈনিক সকাল-সন্ধো আর ছুটির দিনে সর্বক্ষণ বাড়িতে লোকের ভিড় লেগেই আছে। তাকেই হাসিমুখে তাদের চা-জলখাবার সরবরাহ করে যেতে হয়।

ক্যামেরা পারমিটের ব্যাপারে সেনদা আমাদের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করলেন। বললেন, “যা পাচ্ছেন, তাই নিয়ে চলে যান। এক্‌সপোজড্‌ ফিল্ম নিয়ে এখানে চলে আসুন, তখন যা করার করা যাবে।”

গাড়ি পথে অন্যন্য প্রয়োজনীয় বাবস্থার জন্য সেনদা আগামীকাল সকালে ব্রিগেডিয়ার খেরা লেঃ কর্নেল বালির সঙ্গে দেখা করার বন্দোবস্ত করে দিলেন। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, “কলকাতায় কার কার সঙ্গে কথা বলতে চান বলুন।”

ব্যাপরটা যেন কিছুই নয়, ভাবখানা পাশের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলার মতো। সেই ভাবেই একটার পরে একটা লাইন পাওয়া যেতে থাকল। সুশান্তবাবু অমূল্য বাড়ির সঙ্গে কথা বলল, রমেন যুগান্তরে আমাদের পৌঁছনো সংবাদ দিয়ে দিল আর আমি শিলিগুড়িতে অমল তমালের সঙ্গে কথা বললাম।

সব কাজ মিটে যাবার পরে চা খেয়ে বেরিয়ে এলাম সেনদার বাড়ি থেকে। রাত ন"্টা বেজে গিয়েছে। সন্ধের সময় দুপুরের খাবার খেয়েছি। আজ রাতে আর খাবার পাট নেই। পথে মানুষজন খুবই কম। গ্যাংটকের জনবিরল পথ দিয়ে আমরা ফিরে চলেছি ঠাকুরবাড়িতে। সারাদিনের ক্লান্তির অবসান আসন।

তবু সিকিমের ভাবনার হাত থেকে পরিত্রাণ পাই না। আর তা পাবার প্রয়োজনই বা কি? তার চেয়ে গ্যাংটকের নির্জন পথে পদচারণা করতে করতে সুন্দরী সিকিমের ভাবনার মাঝে হারিয়ে যাওয়া মন্দ কি? আমি ভেবে চলি-_

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব-সীমান্তে, যেখানে হিমালয়ের সূল-গিরিশিরা দক্ষিণমুখী হয়েছে, সেখানে সিঙ্গালি-লা চো-লা নামে দুটি পর্বতশ্রেণী রয়েছে। তারা অভেদ্য পর্বড প্রাচীরের মতো এক ডিম্বাকৃতি ভূখণ্ডের তিনদিক বেষ্টন করে আছে। ভূখগুটির চতুর্থ দিকটা

১৬

আস্তে আস্তে নিচু হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমতলে মিশেছে। এই পার্বতরাজাটিই সিকিম সুন্দরী সিকিম।

সিকিম পূর্ব-হিমালয়ের অন্তর্গত একটি পার্বতপ্রদেশ। সিকিমের পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে তিববত, পূর্বে ভুটান আর দক্ষিণে দার্জিলিং জেলা সিকিমের আয়তন ৭১০৭ বর্গকিলোমিটার। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। আমি এখন সেই গ্যাংটকের পথে পদচারণা করতে করতে সুন্দরী সিকিমের কথা ভাবছি। আমি যে সুন্দরের অভিসারে এসেছি।

হিমালয়ের কয়েকটি অতিকায় অনিন্দযসুন্দর শৃঙ্গ সিকিমে অবস্থিত। আর তাই ফ্র্যা্ক এস. স্মাইথ সিকিমকে বলেছেন-__-“11৩ 7019508070 ০01 1115 52512 11177312892",

প্রখ্যাত হিমালয় বিশারদ কেনেথ ম্যাশন ভারতীয় হিমালয়কে পাঁচটি প্রধান ভাগে