পাঁচটি উপন্যাস

পিন চিনি

. ০. 0 ভি চু 2106.53

৮৬ না উট

72/0111 07291৭%3 0) 71980118২০১

1981৭ 1০. 978-81-8374-0657-8 প্রচ্ছদ সুব্রত চৌধুরী অলংকরণ সুব্রত মাঝি

মূল্য

২৫০.০০

12101151091 7দা72581712বিধো। 3/1 0০0109939 7০৬, 140152815 700 0099 71701895 2241 1175, 94330 75550, 98308 06799

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পত্র ভারতী, ৩/১ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত এবং হেমপ্রভা প্রিন্টিং হাউস, ১/১ বৃন্দাবন মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে মুদ্রিত।

পত্র" ভারতী প্রকাশিত বই একটা দেশ চাই

প্রসঙ্গ

দেখতে-দেখতে এই পৃথিবীতে পঁচান্তরটি বছর কাটিয়ে দিলাম। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে এই শতকের প্রথম দশকের শেষাশেষি অবধি ব্যস্ত আমার জীবন। পঁচাত্তর পার করেও আমি বেঁচে আছি।

এই দীর্ঘ সময়টা ভারতের তো বটেই, বিশেষ করে বাঙালির জীবনে কত উত্থানপতন যে ঘটে গেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, তুমুল স্বাধীনতা সংগ্রাম, নৌবিদ্রোহ, লালকেল্পলায় আই এন এর বীর সেনানীদের বিচারের নামে প্রহসন এবং তার প্রতিবাদে সারা ভারত জুড়ে তীব্র বিক্ষোভ, দাঙ্গা, দেশ-বিভাজন থেকে নানা ধরনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি। এর মধ্যে পাকিস্তান দুস্টুকরো হয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র_বাংলাদেশ। এদিকে জঙ্গিহানা, মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, লোকক্ষয়, নাশকতা, অনবরত কত কিছুই তো ঘটে চলেছে।'

রাষ্ট্র তো তোলপাড় হচ্ছেই, বাঙালি মধ্যবিত্ু-জীবনকের এই উত্তাল সময় নানা দিক থেকে প্রচণ্ড ঝাকুনি দিয়ে চলেছে। দেশভাগের পর একদা শরণার্থী হয়ে এদেশে চলে এসেছিলাম। আমি মধ্যবিস্তদেরই একজন। আচটা আমার গায়ে কম লাগছে না।

দীর্ঘকাল বেঁচে থাকলে অনেক কিছু দেখা যায়, অভিজ্ঞতা পরিধি বিস্তৃত হয়। পঁচাত্তর-পেরুনো জীবনে কত কিছুই তো প্রত্যক্ষ করেছি। যা দেখেছি, উপলব্ধি করেছি তার চেয়ে অনেক বেশি। বিপুলভাবে আলোড়িতও হয়েছি।

লেখালেখি শুরু করেছিলাম উনিশশো চুয়ান্ন সালে। তারপর পঞ্চানন বছর ধরে অবিরল লিখেই চলেছি। পঞ্চান্টা বছর কম সময় নয়। এর মধ্যে নানা বিষয়বস্তু নিয়ে কত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং খবরের কাগজের কলমে যা লিখেছি, ভাবলে নিজেই অবাক হয়ে যাই। যতদিন শ্বাসপ্রশ্থাস চালু থাকবে, লিখেও যাব। লেখকের এটাই নিয়তি।

পঞ্ধান্ন বছরে যা লিখেছি, আমার সেই সব সৃষ্টি থেকে পাঁচটি উপন্যাস বেছে নিয়ে এই সংকলন প্রকাশিত হল। আশা করি, পাঠকের ভালো লাগবে।

আগ

পাচ টি উপন্যাস

রণক্ষেত্র

হঠাৎ বসস্ত আপন মনে মাঝখানে একজন

অন্না বাপ

৬৯ ১৩৭. ২৯৯ ২৯১

প্রফুল্ল রায়__পাঁচটি উপন্যাস--২

ডির কাছ থেকেই রিকশা নিয়েছিল দীপা। অনেকগুলো অলিগলি ঘুরে এখন সেটা সঠিক

রাস্তায় এসে পড়েছে।

দীপা শুনেছে ব্রিটিশ আমলে রাস্তাটার নাম ছিল রবসন স্ট্রিট। স্বাধীনতার পর কলকাতা কর্পোরেশন নাম বদলে করেছে হরপ্রসাদ সরণি। হরপ্রসাদ চৌধুরি ছিলেন বিখ্যাত স্বাধীনতা-সংগ্রামী, পরাধীন ভারতে ইংরেজদের জেলে জীবনের অর্ধেক ক্ষয় করেছেন। তার নামেই এ-রাস্তার নাম।

জায়গাটা দক্ষিণ কলকাতায়। এখানে এলে মনেই হয় না, এটা ক্যালকাটা মেট্রোপলিশের একটা অংশ। আশি কি নব্বুই লক্ষ মানুষের এই সুবিশাল শহরের ভিড়, চিৎকার, হইচই, টেনশন, উত্তেজনা, পোড়া গ্যাসোলিনের তীব্র গন্ধ-_কিছুই এখানে নেই। রাস্তাটা নির্জন, চুপচাপ একটা দ্বীপের মতো। 'পপুলেশন এক্সপ্লোশনে'র এই শহরের মধ্যে থেকেও যেন হরপ্রসাদ সরণি কলকাতার বাইরে।

ঝকঝকে রাস্তাটার দু-ধারে প্রচুর গাছপালা-__দেবদারু, কৃষগ্চুড়া বা ঝাড়াল রেনট্রি। আর চোখে পড়ে বিরাট-বিরাট কমপাউন্ডওয়ালা একেকটা বাড়ি। বেশির ভাগই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। গথিক স্ট্রাকচার, মোটা-মোটা থাম, সামনে সবুজ কার্পেটের মতো লন, ফুলের বাগান, টেনিস কোর্ট, লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, ইত্যাদি-ইত্যাদি।

সবে শীতের শুরু। সময়টা ডিসেম্বরের গোড়ার দিক। দারুণ একটা ঠান্ডা এখনও পড়েনি। তবে উত্তুরে হাওয়া এর মধ্যেই এশহরে হানা দিয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ আগে ন'টা বেজেছে। কাছাকাছি কোনও একটা থানার সাইরেনের আওয়াজ থেকেই তা টের পাওয়া গেছে।

দ্রুত একবার কবজি উলটে ছোট্ট ঘড়িটা দেখে নিল দীপা। নস্টা বেজে সাত। সে জানে দশটার ভেতর না পৌঁছুতে পারলে মপিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হবে না। কাটায়-কীটায় দশটাতেই তিনি বেরিয়ে যান। হাতে এখনও প্রচুর সময়, তবু অসহ্য উদ্বেগে দীপার স্াযুগুলো স্টিলের তারের মতো টানটান হয়ে গেল। শুধু উদ্বেগই নয়, অদ্ভুত এক উত্তেজনা এবং মারাত্মক ভয়ও।

এমনিতে দীপা খুবই সাহসী এবং তেজী ধরনের মেয়ে। ব্যক্তিত্বও তার প্রবল। কিন্তু মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে আসার আগে সাতটা দিন ভয়ে এবং অস্থিরতায় ঘুমোতে পারেনি। দু-পা বাড়িয়ে তিন পা পিছিয়ে গেছে। শেষপর্যস্ত ভয়টা অবশ্য কাটিয়ে উঠেছে, মণিমোহনের সঙ্গে দেখা না করে তার উপায় নেই। কেন না, যত দেরি হবে তার পক্ষে অবস্থা ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

দীপার বয়স বাইশ-তেইশ। লম্বাটে ডিমের মতো মুখ। রং বেশ ফরসাই। ভাসা-ভাসা মাঝারি চোখ, পাতলা ঠোট, ধারালো নাক। ছোট কপালের ওপর থেকে চুলের ঘের। চুল বেশ ঘন আর কালো। সেগুলো একবেণী করে পিঠের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে।

পরনে একটা জেলজেলে সিক্কের প্রিন্টেড শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, পায়ে ফম দামের ন্লিপার। সারা শরীরে এক টুকরো ধাতুর চিহ্ন পর্যস্ত নেই। না হার, না চুড়ি, না কিছু। বাহাতের কবজিতে স্টিলের সরু ব্যান্ডে ওয়েস্ট আ্যান্ড ওয়াচ কোম্পানির পুরোনো গোল লেডিজ ঘড়ি। ঘড়িটা ছিল দীপার মায়ের। এটা তাদের বহুকাল আগের প্রায় ভুলে-যাওয়া সুদিনের স্মৃতিচিহ্ৃ। পায়ের কাছে মাঝারি সাইজের চামড়ার সুটকেস। সুটকেসটা /য কত বছর.আগের, দীপা জানে না। ওটার মধ্যে রয়েছে কিছু শাড়ি জামা এবং টুকিটাকি কণ্টা জিনিস।

রণক্ষেত্র ১১

এখন, এই ডিসেম্বর মাসে আকাশের কোথাও একটুকরো মেঘ বা কুয়াশা নেই। শীতের ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে সকালের মায়াবী রোদ সোনালি ঢলের মতো নেমে এসেছে দক্ষিণ কলকাতার এই রাস্তাটায়। ঝলমল করছে চারদিক।

এত বেলাতেও রাস্তায় লোকজন বেশ কম। মাঝে-মাঝে দু-চারটে প্রাইভেট কার, স্কুটার কি সাইকেল হুস করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কোনও দিকেই লক্ষ্য নেই দীপার। যদিও সে মণিমোহনদের বাড়ির নম্বর জানে এবং মাস দুই-তিন আগে এসে দেখেও গেছে, তবু পলকহীন পরপর বাড়িগুলো দেখে যাচ্ছে।

আরও খানিকটা যাওয়ার পর মোড়ের মাথায় সাতষট্রি নম্বর বাড়িটা চোখে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে বুকের ভেতর শ্বাস আটকে গেল দীপার। “এই, থামো, থামো”__কাপা গলায় রিকশা থামিয়ে, ভাড়া মিটিয়ে, সুটকেস হাতে নেমে পড়ল দীপা।

সামনেই লোহার প্রকাণ্ড গেটওয়ালা বাড়িটার গায়ে পেতলের হরফে নম্বরটা বসানো রয়েছে। গেটের দুপাশ থেকে উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল, তার মাথা ঘন লতায় ঘেরা। গেটের ডান পাশের দেওয়ালে পেতলেরই ঝকঝকে প্লেটে বাড়িটার নাম এনগ্রেভ করে লেখা £ এমারেল্ড হাউস।

রিকশাওয়ালা চলে গেছে। তারপরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দীপা। বুকের ভেতর হৃৎপিগুটা আগেই থমকে গিয়েছিল। এখন সেখানে কয়েকশো ঘোড়া একসঙ্গে দৌড়তে লাগল। মিনিট কুড়ি-পঁচিশ আগে রিকশায় ওঠার সময় থেকে যে-ভয় এবং উৎকণ্ঠা এক মুহূর্তের জন্যও তার সঙ্গ ছাড়েনি, সেগুলো হঠাৎ হাজার গুণ বেড়ে গেল।

মাত্র দশ গজ দূরে এমারেল্ড হাউসের বিশাল লোহার গেট। দীপা একবার ভাবল, ওখানে যাবে না। যদি মণিমোহন চ্যাটার্জি তার সঙ্গে দেখা না করেন, বা দেখা করলেও অপমান করে তাড়িষে দেন? তার চাইতে বরং আর-একটা রিকশা ডেকে ফিরেই যাওয়া যাক।

পরক্ষণেই দীপার মনে হল, এমারেম্ড হাউসের দশ গজের মধ্যে এসে এখন আব ফিরে যাওয়া যায় না। তার শরীরিক এবং মানসিক যা-অবস্থা তাতে মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হওয়াটা একাস্ত জরুরি।

দীপা শুনেছে, মণিমোহন চ্যাটার্জি অত্যন্ত রাগী এবং বদমেজাজি, গম্ভীর এবং রাশভারি। প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব তার। তিনি একজন বড় ইন্তাস্ট্রিয়ালিস্ট। ছাড়া বড়-বড় তিন-চারটে কোম্পানির ডাইরেক্টুরও। তবু দীপা যেখানে এসে পৌঁছেছে সেখানে দাঁড়িয়ে এই লোকটার সঙ্গে শেষ যুদ্ধটা করতেই হবে।

হয় এই যুদ্ধে সে জিতবে, নইলে চিরকালের মতো অন্ধকারে তলিয়ে যেতে হবে। মনের সবটুকু সাহস এবং জেদ জড়ো করে এলোমেলো পায়ে দীপা সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

গেটের কাছে আসতেই কোখেকে একটা ধবধবে উর্দিপরা নেপালি দারোয়ান মাটি ফুঁড়েই যেন ওধারে এসে দীড়াল। বলল, “কিসকো মাঙতা?

দীপা বলল, “মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে চাই।'

দারোয়ানের মোঙ্গলিয়ান মুখে রীতিমতো বিস্ময় ফুটল। চাপা চোখ দুটো অনেকখানি বড় করে দীপার পা থেকে মাথা পর্যস্ত দ্রুত একবার দেখে নিল সে। খেলো পোশাক, হাতে রং- উঠে-যাওয়া পুরোনো সুটকেস। এভাবে কেউ এ-বাড়িতে আসে না। দারোয়ান জানতে চাইল, বড়ে সাব অর্থাৎ মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে মোলাকাত করার ব্যাপারে আগে থেকে আ্যাপয়েম্টমেন্ট করা আছে কিনা।

দীপা মাথা নাড়ল-_ত্যাপয়েন্টমেন্ট করা নেই।

দারোয়ান কপাল কুঁচকে বলল, “তব্‌ তো বহোত মুশকিল হো গিয়া।'

দীপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। উদ্িগ্ন মুখে সে বলল, ম্কীসের মুশকিল £

১২ পাঁচটি উপন্যাস

দারোয়ান জানায়, আযাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া বড়ে সাব কারও সঙ্গে দেখা করেন না।

দীপা ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করল, “তাহলে কি দেখা হবে না? একটু ভেবে আবার বলল, “আমি খুব বিপদে পড়ে তার কাছে এসেছি।,

দারোয়ান সন্দিশ্ধ চোখে কিছুক্ষণ দীপাকে লক্ষ্য করল। তারপর জিগ্যেস করল, “বড়ে সাবের সাথ আপনার কী দরকার? নৌকরি-উকরির জন্যে এসেছেন?

দীপা অবাক হয়ে গেল, “নৌকরি-উকরি-_মানে চাকরি?

হী?

দারোয়ান একপাশে ঘাড় হেলিয়ে বুঝিয়ে দিল, অনেকেই চাকরি-বাকরির জন্য বড়ে সাবকে উত্যক্ত করে তোলে। তাই বড়ে সাবের কড়া হুকুম, চাকরির উমেদারদের যেন বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া হয়। দীপা যদি তেমন উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে, বড়ে সাবের সঙ্গে দেখা হবে না।

দারোয়ানের কথায় সামান্য ভরসা পাওয়া গেল। জোরে শ্বাস টেনে দীপা দ্রুত বলে উঠল, না-না, আমি চাকরির জন্যে আসিনি ।'

একটু চুপ করে থেকে দারোয়ান বলল, “আপনার সাথ বড়ে সাবের জান-পয়চান আছে?

দারোয়ানটা একেবারে বিরুদ্ধ পক্ষের উকিলের মতো জেরা শুরু করে দিয়েছে। জবরদস্ত শিল্পপতির লোক তো-_মনে-মনে ভাবল দীপা। বলল, 'না-না, উনি আমাকে চেনেন না। কখনও দেখেননি ।'

কী একটু ভাবল দারোয়ান। হয়তো দীপার চেহারা বা পোশাক-টোশাক দেখে তার কিছুটা করুণাই হয়ে থাকবে। বলল, “থোড়া ঠহ্র যাইয়ে। বড়ে সাবের কাছে আপনার কী নাম বলব?

“নাম বলে লাভ নেই। বলবেন জরুরি কাজে একটি মেয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।'

“ঠিক হ্যায়।”

বন্ধ গেটের বাইরে দীপাকে দীড় করিয়ে দারোয়ান চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দীপার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যেতে লাগল যেন। মণিমোহন চ্যাটার্জি কি তার সঙ্গে দেখা করবেন?

মিনিট তিনেক বাদে দারোয়ানটা ফিরে এল। আন্তে-আস্তে মাথা নেড়ে বলল, “মোলাকাত নেহী হোগা।”

এমনিতে মোঙ্গলিয়ানদের ভাবলেশহীন মুখে সুখ-দুঃখ আনন্দ বা হতাশা, কিছুই তেমন ফোটে না। তবু দারোয়ানটাকে দেখে মনে হল, মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দীপাকে দেখা করিয়ে দিতে পারলে সে খুশিই হত।

দেখা হবে না! অত্যন্ত হতাশ দেখাল দীপাকে। তার পা দুটো থরথর করে কাপতে শুরু করেছে। চারপাশের দৃশ্যাবলী দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মনে হল, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, হড়মুড় করে হাঁটু ভেঙে, ঘাড় গুঁজে পড়ে যাবে।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তার পরেই অদম্য এক সাহস এবং রাগ তার ওপর ভর করল যেন। নিজের অজান্তে সে চেঁচিয়ে উঠল, “দেখা না করে আমি যাব না। কিছুতেই না।

দারোয়ানটা চমকে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও যাকে ভীরু এবং কুঠিত মনে হয়েছে, খুব নীচু গলায় ভয়ে-ভয়ে যে কথা বলছিল, আচমকা তাকে এভাবে চিৎকার করতে দেখলে হৃকচকিয়ে যাওয়ারই কথা। দারোয়ান বোঝাতে চাইল, বড়ে সাব খুব ব্যস্ত আছেন, এখন কারও সঙ্গে কথা বলার সময় নেই তবার। ইচ্ছা হলে, দীপা তার ঠিকানা দিয়ে যেতে পারে। পরে সুবিধেমতো বড়ে সাব যোগাযোগ করে নেবেন। তখন দীপা তার জরুরি কথা বলার সুযোগ পাবে।

গলার স্বর আর-এক পরদা চড়িয়ে দিল দীপা, “পরে নয়। এখনই তার সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে।

রণক্ষেত্র ১৩

দারোয়ান এবার ভয়ে-ভয়ে বাড়িটার ভেতর দিকে তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল, “দিদিজি, আপ যাইয়ে। চেল্লামেলি করলে বড়ে সাব বহুত গুস্সা করবেন।'

কণ্ঠস্বর একই জায়গায় রেখে দীপা বলল, “গুস্সা করলে করবেন। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তুমি যদি দেখা করিয়ে না দাও, আমি গেটের বাইরে বসে থাকব। বাড়ি থেকে বেরুতে তো হবেই। তখন তোমার বড় সাহেবকে ধরব।” দারোয়ানকে প্রথম-প্রথম সে আপনি করেই কথা বলছিল। এখন প্রচণ্ড উত্তেজনার বশে “তুমি' করে বলতে শুরু করেছে।

দারোয়ান খুবই বিপন্ন বোধ করল। সাহেব সকালের দিকটা নিজের ফ্যাক্টনি এবং অফিসের নানা কাজকর্ম নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন। এই সময় হইচই করলে কাজে মন দিতে পারেন না। ফলে ভীষণ রেগে যান। এদিকে এই অচেনা মেয়েটা চেঁচামেচি করে তাকে কি ফেসাদেই না ফেলেছে। তাকে থামাবার জন্য হাতজোড় করে বলতে লাগল, “আপ আজ যাইয়ে দিদিজি। অন্য দিন আসুন, জরুর মোলাকাত করিয়ে দেব।'

কিন্তু দারোয়ানের কাকৃতিমিনতি কিছুই কানে তুলল না দীপা। উন্মাদের মতো সে সমানে চিৎকার করে যেতে লাগল।

যখন এই সব চেঁচামেচি চলছে সেই সময় ভেতর দিক থেকে একটা আধবুড়ো বেয়ারা গোছের লোক দৌড়তে-দৌড়তে গেটের কাছে চলে এল। শশব্যস্তে বলল, “কী হচ্ছে সব? কে এত হল্লা করছে? সাহেব রাগ করছেন

দারোয়ান কিছু বলার আগেই দীপা বলে উঠল, “আমি হল্লা করছি। তোমাদের সাহেব যতক্ষণ আমার সঙ্গে দেখা না করছেন, আমি ঠেঁচিয়ে-েচিয়ে সাত পাড়ার লোক জড়ো করে ফেলব। যাও, বলো গিয়ে তোমার সাহেবকে ।'

বেয়ারাটা হতভন্বের মতো দু-চার সেকেন্ড দাড়িয়ে রইল। তারপর উর্ধ্বশাসে বাড়ির দিকে ছুটল এবং একটু পরেই আবার ফিরে এসে বলল, “আসুন আমার সঙ্গে দারোয়ানকে বলল, “গেট খোল ।' মন্ত্রচালিতের মতো দারোয়ান ধাতব শব্দ করে লোহার বিশাল গেট খুলে দিল।

দুই

আগে ভালো করে লক্ষ্য করেনি দীপা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, নুড়ির রাস্তা সোজা সামনের দিকে চলে গেছে। সেটার একদিকে সবুজ কার্পেটের মতো লন। সেখানে অনেকগুলো গার্ডেন আমব্রেলার তলায় বেতের সোফা-টোফা সাজানো। একটা মালি মোয়ার দিয়ে সমান মাপে ঘাস ছেঁটে যাচ্ছে। রাস্তাটার আর-এক দিকে নানারকম মরশুমি ফুলের বাগান। সেখানে অন্য একটা মালি বড় কীাচি দিয়ে ফুলগাছের বুড়ো পাতা বা শুকনো ডাল ছেঁটে দিচ্ছে। লনের ওধারে উঁচু কমপাউন্ড ওয়ালের গায়ে টানা ব্যারাকের মতো খানকয়েক ঘর গা-ঘেঁষার্ঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই টের পাওয়া যায়, ওগুলো সার্ভেন্ট এবং মালিদের কোয়া্টার্স। নুড়ির রাস্তাটা সোজা গিয়ে বিরাট থামওয়ালা একটা তেতলা বাড়ির সিঁড়ির কাছে থেমেছে। বেয়ারাটার সঙ্গে নুড়ির রাস্তা পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এল দীপা। এখানে মোটা- মোটা অগুনতি থাম লাইন দিয়ে দীড়িয়ে আছে। সিঁড়ির পেছনে চৌকো-চৌকো শ্বেত-পাথর বসানো অনেকখানি জায়গা জুড়ে বারান্দা। তারপর থেকে সারি-সারি ঘরগুলো। দরজা-জানালা বিরাট- বিরাট। জানালাগুলোর দুটো পরে পাল্লা। একটা খড়খড়ি, অন্যটা পালকাটা রঙিন কাচ। বেয়ারা একটা ঘর দেখিয়ে বলল, “এখানে একটু বসুন। বড় সাহেব এখনই আসবেন।, বেয়ারা চলে গেল। আর দীপা আস্তে-আস্তে সামনের প্রকাণ্ড ঘরটায় গিয়ে ঢুকল।

১৪ পাঁচটি উপন্যাস

গোটা ঘরটার মেঝে ছইঞ্চি পুরু দামি কার্পেটে মোড়া। চারদিকে কম করে সাত-আট সেট সোফা ছাড়া সুদৃশ্য কাশ্মীরি কাঠের স্ট্যান্ডে পেতলের নকশাদার ফ্লাওয়ার ভাস। দুপাশের দেওয়াল কেটে কাচের পাল্লা বসিয়ে নানা ধরনের বই রাখা আছে। হিস্ট্রি সোশিওলজি আ্নপ্রোপোলজি থেকে শুর করে নানা সাবজেক্টের বই। তা ছাড়া আছে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা এবং ওয়ার্ড বুক সিরিজের সেট। এত বিচিত্র ধরনের বই জীবনে কখনও চোখে দেখেনি দীপা।

একটা দেওয়াল ঘেঁষে উচু স্ট্যান্ডে টিভি আরেকটা দেওয়ালের পুরোটা জুড়ে আ্যাকুয়েরিয়ামে নানা দেশের লাল নীল সবুজ হলুদ, এমনি বিচিত্র রঙের মাছেরা খেলা করছে। সিলিং থেকে ঝাড়লঠনের মতো আলোর ঝাড় নেমে এসেছে। দুই দেওয়ালে দুটো এয়ারকুলার।

সুটকেস নামিয়ে একটা সোফার কোণের দিকে জড়োসড়ো হয়ে বসল দীপা। এখান থেকে লন মালি গেট ফুল অর্কিউ-_-সবই দেখা যাচ্ছে।

দীপা আগেই শুনেছিল মণিমোহন চ্যাটার্জিরা বিরাট বড়লোক শুনতে-শুনতে মোটামুটি একটা ধারণা করে নিয়েছিল। এখন বাড়ির ভেতর পা দিয়ে মনে হচ্ছে, যা সে ভেবেছিল, মণিমোহনরা তার চাইতে অনেক গুণ বেশি বড়লোক

হঠাৎ আবছাভাবে পায়ের আওয়াজ কানে এল। এই বিশাল ড্রইংরুমটার অনেকগুলো দরজা। চমকে মুখ ফেরাতেই দীপা দেখতে পেল, ভেতর দিকের দরজার কাছে মধ্যবয়সি একটি পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স ষাটের কাছাকাছি। গায়ের রং বাদামি। ছ+ফুটেরও বেশ হাইট। লম্বাটে ভরাট মুখ, চওড়া কপাল, ধারালো চিবুক, পুরু ঠোট এবং কঠিন চোয়াল।

'বৃষস্কন্ধ' বলে একটা কথা আছে, ভদ্রলোককে দেখলে তাই মনে পড়ে যায়। ছড়ানো বিশাল কাধ তার, হাত দুটো হাটু ছাড়িয়ে নেমে এসেছে। মোটা-মোটা হাড়ের ফ্রেমে মজবুত সুদৃঢ় স্বাস্থ্য। কাচাপাকা চুল ব্যাক-ব্রাশ করা।

সব চাইতে বিস্ময়কর তাঁর চোখ। গায়ের রং-এর মতোই মণি দুটো বাদামি। তার তাকানোর ভঙ্গি, মোটা রোমশ ভুরু, শক্ত চিবুকের গঠন- এ-সবের মধ্যে তার ব্যক্তিত্ব যতটা, তার চাইতে অনেক বেশি নিষ্ঠুরতা যেন ফুটে রয়েছে। এই মানুষটাকে ঘিরে কোথায় যেন মোটা-মোটা অদৃশ্য দেওয়াল খাড়া হয়ে আছে। সেগুলো ভেঙে তার কাছাকাছি যাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার।

এমন এক প্রচণ্ড শক্তিমান প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতা প্রায় অসম্ভব। এমারেন্ড হাউসে আসার আগে বারকয়েক শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দীপার। আরও একবার হল পনেরো ফুট দূরে দরজার ফ্রেমের নীচে দাড়ানো মানুষটিকে দেখে নিজের অজান্তে কখন যে উঠে দাঁড়িয়েছে, দীপা টের পায়নি। সে বুঝতে পারছিল ইনিই মণিমোহন চ্যাটার্জি দিয়ে তীক্ষ চোখে দীপাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন তিনি। আযাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসার জন্য বিরক্তিতে তার কপাল কুচকে আছে। দীপার জেলজেলে শাড়ি, রুল্ষ্ন চুল, খেলো চটি ইত্যাদি দেখতে-দেখতে বিরক্তির সঙ্গে তাচ্ছিল্য এবং কিছুটা ঘৃণাই যেন মিশল।

মিনিটখানেক একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর মণিমোহন ঘরের মাঝখানে চঙ্গে এলেন। গম্ভীর কর্কশ গলায় বললেন, “গেটের কাছে দাঁড়িয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করছিল্লে কেন?

ভয়ে কাঠ হয়ে যেতে-যেতে আচমকা দীপার মধ্যে কি একটা ম্যাজিক ঘটে গেল যেন। সে বুঝতে পারছিল, সমানে-সমানে যুদ্ধ না করে মিইয়ে বা কুঁকড়ে থাকলে মণিমোহন তাকে গুঁড়িয়ে ফেলবেন। দুর্জয় সাহস এবং জেদ নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। সেসব আবার ফিরে এল যেন। শ্থাসক্রিয়া আবার স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। ফুসফুসে অনেকখানি বাতাস টেনে দীপা বলল, “অসভ্যের মতো চিৎকার না করলে আগনি বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না।'

রণক্ষেত্র ১৫

ভেতরে-ভেতরে একটু থমকে গেলেন মণিমোহন। এরকম সাজগোজ এবং চেহারার একটি মেয়ে তার সামনে এসে ঘাড় নুইয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু সে যে এভাবে মুখের ওপর জবাব দেবে, মণিমোহন ভাবতে পারেননি বললেন, “তুমি জানো না, আযাপয়েম্টমেন্ট ছাড়া আমি কারও সঙ্গে দেখা করি নাঃ

“জানতাম না। আপনার দারোয়ান একটু আগে আমাকে বলেছে। অবশ্য--' কথা শেষ না করে দীপা থেমে গেল।

'অবশ্য কি? কপাল আরও কুঁচকে গেল মণিমোহনের।

“আগে থেকে চেষ্টা করলেও আমার মতো একটা মেয়েকে আ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতেন কি?

এমন মেয়ে আগে আর কখনও দেখেননি মণিমোহন।

সত্যিই তিনি একে দেখা করার সুযোগ দিতেন না। মনে-মনে তিনি স্বীকার করলেন, মানুষ চেনার অপরিসীম ক্ষমতা এই মেয়েটার দীপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি পালটা প্রম্ন করলেন, “কী নাম তোমার?

“আমি মার্গারেট থ্যাচার কি ইন্দিরা গান্ধীর মতো বিখ্যাত মহিলা নই যে নাম বললেই চিনতে পারবেন। তবু যখন জানতে চাইলেন তখন বলছি__আমার নাম দীপা, দীপা মণ্ডল।"

মণিমোহন বুঝতে পারছিলেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিত্ব দিয়ে বা গম্ভীর গলায় কথা বল্ল এই মেয়েটি অর্থাৎ দীপাকে নোয়ানো যাবে না। তিনি বললেন, “তুমি আমার কাছে কী চাও &

দীপা বলল, “ঠিক এক কথায় তা বলা যাবে না। দয়া করে আপনি যদি বসেন, আমিও বসতে পারি। তারপর আপনার কাছে আসার কারণটা জানাচ্ছি।”

দীপা যেভাবে তাকে বসতে বলল তাতে মনে হচ্ছে, এই বাড়ি-টাড়ি তার নয়-_দীপার। তিনিই এখানে দীপার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। রেগে উঠতে গিয়েও কিছুটা মজাই যেন লাগল মণিমোহনের, কিন্তু বাইরে তা ফুটে উঠতে দিলেন না। নীরস রুক্ষ গলায় বললেন, “বসবার সময় নেই। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফ্যালো।'

“এত কথা দাঁড়িয়ে-দদাড়িয়ে বলা যায় না। দয়া করে বসুন।” অত্যন্ত বিনীত ভাবেই বলল দীপা, তবু তার বলার ভঙ্গিতে কোথায় যেন খানিকটা জেদ রয়েছে।

“ঠিক আছে, বোসো।” কবজি উলটে ঘড়ি দেখে নিয়ে মশিমোহন বললেন, “দশ মিনিট সময় দিতে পারি। তার মধ্যে তোমার বক্তব্য শেষ করতে হবে।' বলতে-বলতে একটা সোফায় বসে পড়লেন মণিমোহন।

যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডে তার জেদটার জয় হওয়াতে দীপার আত্মবিশ্বাস বেশ কিছুটা বেড়ে গেল। একটু দূরে আগের সেই সোফায় মণিমোহনের মুখোমুখি বসে পড়ল সে।

বললেন, “এবার বলো-_, পরক্ষণেই তার চোখ এসে পড়ল দীপার সেই রং-ওঠা কালচে সুটকেসটার ওপর। দীপার সোফার পাশে কার্পেটের ওপর সেটা সন্তর্পণে দীড় করানো আছে।

মণিমোহন একটু অবাক হয়েই এবার বললেন, 'এ কি, সুটকেস নিয়ে এসেছ কেন? এরকম লটবহর নিয়ে কেউ কখনও কারও সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে, এটা তার কাছে অভাবনীয়।

সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিল না দীপা। স্থির চোখে এক পলক মণিমোহনকে দেখে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এবার সে আসল জায়গায় পৌঁছে গেছে। শরীরে এবং মনে যেখানে যতটুকু শক্তি এবং সাহস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সব এক জায়গায় জড়ো করে দীপা আস্তে-আস্তে বলল, 'আমি এখানে থাকতে এসেছি। সুটকেসে আমার জামাকাপড় আছে।,

নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না মণিমোহন। তীব্র চাপা গলায় বললেন, “হোয়াট £

১৬ পাঁচটি উপন্যাস

দীপা ফের একইরকম কণ্ঠস্বরে বলতে লাগল, “এখানে থাকতে এসেছি। বলতে পারেন, আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।'

দীপার কথা শেষ হতে-না-হতেই চিৎকার করে উঠলেন মণিমোহন, “অধিকার-__ মানে রাইট! হোয়াট ডু ইউ মিন?

দীপা মণিমোহনের দিকে তাকাল না। চোখ নামিয়ে অনেকক্ষণ ঠোটে ঠোট চেপে শ্বাসরুদ্ধের মতো বসে রইল।

মণিমোহন অসহিষুও হয়ে উঠেছেন। বললেন, “চুপ করে রইলে কেন? বলো- কীসের অধিকার?”

চোখ তুলল না দীপা। মেঝের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বলতে লজ্জা করছে, তবু নিজের ভবিষ্যৎ আর আপনাদের পরিবারের সুনামের জন্যে না বলে উপায় নেই।

শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান করে অপেক্ষা করতে লাগলেন মণিমোহন।

দীপা এবার বলল, “আমার পেটে অনীশের বাচ্চা রয়েছে।'

মণিমোহনের মাথার ভেতর একটা জুলস্ত পেরেক ঢুকে গেল যেন। কর্কশ গলায় তিনি বললেন, “কে অনীশ?

আপনার ছেলে?

নিজের অজান্তেই মণিমোহন খাড়া দাড়িয়ে পড়লেন। তার শরীরের রক্তচাপ হঠাৎ যেন অত্যস্ত বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। চোখের সাদা অংশে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে লাগল গলার শিরগুলো দড়ির মতো পাকিয়ে উঠল। অত্যন্ত হিংস্র এবং নিষ্ঠুর দেখাল মণিমোহনকে। তার গলার পেশি ছিড়ে একটা জান্তব চিৎকার বেরিয়ে এল, ইম্পসিবল- ইম্পসিবল। আমি বিশ্বাস করি না।

দীপাও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, “আপনার জায়গায় আমি হলেও বিশ্বাস করতে চাইতাম না। নিজের ছেলের সম্বন্ধে এসব কে আর বিশ্বাস করতে চায়?

“স্টপ দিস লাই।'

দীপা যেটুকু লেখাপড়া জানে তাতে এই ইংরেজি শব্দ তিনটের মানে বুঝতে অসুবিধে হল না। সে বলল, “আমি যে বলেছি তার একটা বর্ণও মিথ্যে নয়। ধমকে, চিৎকার করে আপনি আমাকে থামাতে পারবেন না।,

মণিমোহনের চোয়াল পাথরের খিলানের মতো শক্ত হয়ে উঠল। দীতে দাত ঘষে গলার স্বর আরও কয়েক পরদা চড়িয়ে দিলেন, “ইউ ডার্টি উম্যান, তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে এসেছ?

ডার্টি উম্যান কথাটার অর্থ দীপা জানে কিন্ত ব্ল্যাকমেল শব্দটা তার সম্পূর্ণ অজানা অপমানে তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। তীব্র গলায় বলল, “আমি বাজে নোংরা মেয়ে নই, ভদ্র পরিবারের মেয়ে। একটু থেমে বলল, 'ব্ল্যাকমেল বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?

“ভয় দেখিয়ে এ-বাড়িতে ঢুকতে চাইছ! কিন্তু তা হবে না।' বলতে-বলতে মণিমোহনের চোখমুখ সন্দিষ্ধ হয়ে উঠল, 'কে তোমাকে বাড়িতে পাঠিয়েছে?

দীপা বলল, “কেউ না। আমি নিজেই এসেছি। ভয় দেখিয়ে আপনার পুত্রবধূ হওয়ার কোনওরকম ইচ্ছাই আমার নেই। সেটুকু আত্মসম্মান বোধ আমার আছে। কিন্তু এখন আমি নিরুপায়।,

'এই মুহূর্তে তুমি যদি এখান থেকে বেরিয়ে না যাও, আমি পুলিশ ডাকবা।'

দীপা অদ্ভুত হাসল। বলল, "ডাকতে পারেন, আমার আপত্তি নেই। এখানে আসার আগে আমিও থানায় যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। পরে ভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা না করে কিছু করা ঠিক হবে না। ভাবলাম, সব শুনে আপনি আমাকে বিপদ আর লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবেন।'

রণক্ষেত্র ১৭

মেয়েটার স্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে গেলেন মণিমোহন। সে যদি সত্যি-সত্যিই ব্ল্যাকমেলের উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এমন দুঃসাহসী ক্রিমিনাল খুব কমই জন্মেছে কিন্তু তার অপকট মুখ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে এক-একবার সংশয় হচ্ছে, মেয়েটা বোধহয় মিথ্যে বলছে না। জীবনে অসংখ্য মানুষ দেখেছেন মণিমোহন, বিপুল তার অভিজ্ঞতা। তিনি জানেন, সত্যের নিজস্ব একটা জোর আছে। কিন্তু মেয়েটা যা বলছে তা যদি আদৌ মিথ্যে না হয়? না, না, ভাবনাটাকে এক ধাক্কায় মাথা থেকে বার করে দিলেন মণিমোহন। তারপর আবার যখন চিৎকার করতে যাবেন সেই সময় চোখে পড়ল, ঘরের বাইরে বেয়ারা এবং মালিরা এসে জড়ো হয়েছে। উগ্র রক্তাক্ত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে হাতে নাড়লেন মণিমোহন, “যাও-_কী দরকার এখানে % বলে তার খেয়াল হল, এভাবে টেঁচামেচি করা ঠিক হয়নি! এ-জাতীয় নোংরা জঘন্য ব্যাপার, তা যতই মিথ্যে হোক, চাকর-বাকরদের কানে যাওয়া ঠিক নয়। তারা এই নিয়ে চারদিকে চাউর করে বেড়াবে।

মালি এবং বেয়ারারা উর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেছে। মণিমোহন আবার দীপার দিকে ফিরলেন। রাগ উত্তেজনা হিংস্রতা এবং প্রবল রক্তচাপে তার মাথার ভেতরটা টগবগ করে ফুটছিল। কিন্তু এবার আর বিস্ফোরণ ঘটতে দিলেন না। প্রাণপণে গলার স্বরটা অনেকখানি নামিয়ে আস্তে-আস্তে মণিমোহন বললেন, “সিট ডাউন-_, দীপা বসলে মণিমোহনও ফের মুখোমুখি বসলেন। মাথার ভেতরে যা-ই চলুক, খুব শাস্ত গলায় জিগ্যেস করলেন, “তোমরা কোথায় থাকো

“ঢালিপাড়ায়।,

“ঠিক বস্তিতে নয়। বস্তিতে ঢোকার মুখে যে গলিটা রয়েছে, অঘোর নন্দী লেন, তারই একটা বাড়িতে।'

“বাড়ির নম্বর কত?'

“তেরো।

এত কথা যে মণিমোহন জিগ্যেস করছেন সেটা অকারণে নয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন, দীপা ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়। তর্জন-গর্জন করে বা ধমকধামক দিয়ে তাকে দমানো যাবে না। তাকে নাড়াচাড়া করতে হবে অন্যভাবে সে জন্য তার সম্পর্কে খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানা দরকার।

মণিমোহনের কণ্ঠস্বর এবং ব্যবহার হঠাৎ যেভাবে বদলে গেল তাতে অস্বস্তি বোধ করল দীপা। এতক্ষণ অনবরত হুমকি দেওয়ার পর তার এই নতুন চালটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ভেতরে- ভেতরে সে খুবই সতর্ক হয়ে রইল।

মণিমোহন এবার বললেন, “কে-কে আছে তোমার?

দীপা স্থির চোখে মণিমোহনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবামা আর ছোট ভাই।,

“বাবা কী করেন?

“কিছু না। একটা লোহার কারখানায় কেরানি ছিলেন। তিন বছর হল, কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর কোথাও কাজ পাননি।

“ভাই ছোট না বড়?

দু-বছরের ছোট।,

“সে কিছু করে?

'না। ক্লাস এইট পর্যস্ত পড়েছিল। মাইনে দিতে না পারায় স্কুল থেকে নাম কেটে দিয়েছে। ওই পড়াশোনায় চাকরি হয় না। এখন মস্তানি করে বেড়ায়।

“আই সি। তাহলে তোমাদের সংসার চলে কী করে?

“আমি ঢালিপাড়ার প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করি। আর সকাল-বিকেল টিউশনি এতে কোনও

প্রফুল্ল বায়-_পাঁচটি উপন্যাস-_-৩

১৮ পাঁচটি উপন্যাস

রকমে চলে।'

কতদূর পড়াশোনা করেছ?

“তাহলে তুমি ছাড়া রোজগার করার আর কেউ নেহা?

না!

মণিমোহনের হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল। ব্যস্তভাবে ঘড়ি দেখে বললেন, “তোমাকে দশ মিনিট সময় দেব বলেছিলাম। বেয়াল্লিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। এবার আমাকে উঠতে হবে।

দীপা চমকে উঠল, "আমার-_-আমার কী হবে?

মণিমোহনের চোখের বাদামি তারা থেকে এবার আগুন ছুটতে লাগল। দাঁতে দাত চেপে, চাপা গলায় তিনি বললেন, “বদমাশ মেয়ে, যার ভাই মস্তান, বাবা বেকার, যারা বস্তিতে থাকে, আমি তাকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলব! তুমি ভেবেছ কিঃ ব্ল্যাকমেল করার জায়গা পাওনিঃ,

ব্টাকমেল শব্দটার মোটামুটি একটা মানে আন্দাজ করে নিয়েছিল দীপা। তীক্ষ গলায় বলল, “আমি আপনাকে ব্ল্যাকমেল করতে আসিনি।

তুমি যা বলছ তার প্রমাণ কী?

ঠোট টিপে কী যেন ভাবল দীপা। তারপর জোরে শ্বাস টেনে বলল, “অনীশ বাড়ি আছে?

মণিমোহন হকচকিয়ে গেলেন। “তাকে_ তাকে দিয়ে কী হবে?

“দয়া করে তাকে এখানে ডাকান। আমার অবস্থার জন্য কে দায়ী, প্রমাণ কবে দেব।,

“ঠিক আছে।” দীপার চ্যালেঞ্জটা প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই নিলেন মণিমোহন। একটা বেয়ারাকে ডেকে বললেন, “ছোট সাহেবকে এখানে আসতে বলো। বলবে, আমি ডেকেছি।

দু-মিনিট পর অনীশ ড্রাইংরুমে এসে ঢুকল এবং দীপাকে দেখে থমকে দীড়িযে পড়ল। তার চোখে ভয়ের ছায়া পড়েছে।

এমনিতে অনীশ বেশ সুপুরুষ। মণিমোহনের মতোই হাইট। তবে গায়ের রং টকটকে নয়-_ বাদামি। চুল ব্র্যাকব্রাশ করা, নাকমুখ কাটা-কাটা, চওড়া কপাল, ধারালো থুতনি। এই মুহুর্তে তাকে ফাদে-পড়া ইঁদুরের মতো দেখাচ্ছে। ঠোট টিপে আডষ্ট ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে আছে।

দু-দিক থেকে দীপা আর মণিমোহন পলকহীন অনীশকে লক্ষ্য করছিলেন। অনীশ কিন্ত সোজাসুজি কারও দিকেই তাকাতে পারছিল না। চোখের কোণ দিয়ে একবার বাবাকে, একবার দীপাকে দেখছিল। বিশেষ করে দীপাকে। তাকে বাড়িতে বাবার সঙ্গে ড্রাইংরুম দেখবে, অনীশ কখনও ভাবতেও পারেনি।

মণিমোহন দীপাব দিকে আঙুল বাড়িয়ে রুক্ষ গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন, “এই মেয়েটিকে চেনো?

অনীশ ভয় এবং অস্বাচ্ছন্দ্য কাটিয়ে ওঠার জন্য ভেতরে-ভেতরে নিজের সাঙ্গেই যেন প্রাণপণে যুদ্ধ করছিল। চোখে-মুখে নকল বিস্ময় ফুটিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বলতে চাইল, 'না।" তবু গলাটা সামান্য কেঁপে গেল।

দক্ষিণ কলকাতার এই নিরিবিলি রাস্তা, মণিমোহনের সাজানো ড্রইংরুম, বাইল্লের লন, বাগান _দীপার চোখের সামনে সমস্ত কিছু ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। পায়ের তলায় ফ্রার্পেট- মোড়া মেঝে ঢেউয়ের মতো দুলতে লাগল। মুখ থেকে দ্রুত সব রক্ত নেমে যাচ্ছে তার। কিস্তু মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তার পরেই দীপার মাথার ভেতর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কিছু একটা ঘটে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। দীতে দীত চেপে স্থির চোখে অনীশের দিকে তাকাল সে।

এদিকে মণিমোহন অনীশকে বলছিলেন, 'একে দেখোনি কোনওদিন?

এতক্ষণে অস্বাচ্ছন্দ্য এবং নার্ভাস ভাবটা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে অনীশ। নীরসট্ট গলায়

রণক্ষেত্র ১৯

সে বলল, 'না।

“আই সি” মণিমোহন এবার বললেন, “কিন্ত এই মেয়েটি তোমার সম্বন্ধে সিরিয়াস আালিগেশন এনেছে। কী বলেছে জানো?

উত্তর না দিয়ে অনীশ অপেক্ষা করতে লাগল।

গলা খাকরে মণিমোহন বললেন, “মেয়েটি বলছে, সে প্রেগনেন্ট। এর জন্যে তোমাকে দায়ী করছে।'

প্রথমে চমকে উঠল অনীশ। তার পরেই গলার শির ছিড়ে চিৎকার করল, “লাই-__-আটার লাই। পুরোটাই বানানো আর মিথ্যে। ছুটবে। শিরর্দীড়া বেয়ে গলগল করে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। দীপা কিন্তু চিৎকার করল না। তীব্র মোচড়ে শরীরটাকে পুরোপুরি অনীশের দিকে ঘুরিয়ে তীক্ষ চাপা গলায় জিগ্যেস করল, “তুমি আমাকে চেনো নাঃ কখনও দেখোনি?,

“নো-_নেভার! কে আপনি?” রুক্ষ, বিরক্ত মুখে বলল অনীশ!

“মিথ্যেবাদী, নির্লজ্জ” _দীপা বলতে লাগল, “তুমি যে আমাকে চেনো, কম করে পঞ্চাশটা লোক তার সাক্ষী আছে।

অনীশ মণিমোহনের দিকে ফিরে বলল, “বাবা, শি ইজ ডেঞ্জারাস উম্যান। আমাদের ব্টাকমেল করতে এ-বাড়িতে ঢুকেছে।'

মণিমোহন বললেন, “আমারও সেইরকমই মনে হয়েছিল। তোমার মুখে শুনবার জন্যে ডেকে পাঠিয়েছি।' দীপার দিকে ফিরে দরজা দেখিয়ে বললেন, “গেট আউট এই মুহূর্তে এখান থেকে বেরিয়ে যাও)

মবিয়া ভঙ্গিতে দীপা বলল, “আমি যাব না।”

মণিমোহন বললেন, “ধৈর্ধের একটা সীমা আছে। এক মিনিটের ভেতর এখান থেকে না গেলে আমার চাকর আর দারোয়ানেরা তোমাকে লাথি মারতে-মারতে বার করে দেবে।'

'বার তো করে দিতে চাইছেন। আমার পেটের বাচ্চার কী হবে

উত্তর না দিয়ে, লম্বা-লম্বা পা ফেলে দরজার কাছে চলে গেলেন মণিমোহন। উত্তেজিত গলায় ডাকলেন, 'লছমন, তরখু সিং, লালধারী-_ইধার আও।'

মুখ থেকে হুকুম খসতে-না-খসতেই আধ ডজন বেয়ারা-টেয়ারা দৌড়ে এল। মণিমোহন দীপাকে দেখিয়ে বললেন, “এই আওরতের ঘাড় ধরে গেটের বাইরে বার করে দিয়ে এসো।

দীপা বলল, "খবরদার, আমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি।” মণিমোহনকে বলল, “আজ আমাকে তাড়িয়ে দিলেন কিন্তু আমি আপনাদের ছাড়ব না। আমার ক্ষতি করে দিয়ে আপনার ছেলে পার পেয়ে যাবে, তা আমি কিছুতেই হতে দেব না। কিছুতেই না-_

মণিমোহন গর্জে উঠলেন, “গেট আউট।'

নাক-মুখ ঝাঝা করছে দীপার। অপমানে কপালের রগগুলো যেন ছিঁড়ে যাবে। কিছুই যেন সে দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধের মতো টক্কর খেতে-খেতে ড্রইংরুমের বাইরে বেরিয়ে এল দীপা। তারপর প্রায় টলতে-টলতে লন এবং বাগানের মাঝখানে নুড়ির রাস্তার ওপর দিয়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল।

কয়েক পা যেতে-না-যেতেই কার যেন অস্পষ্ট ডাক কানে এল দীপার, “এ আওরত, আওরত-_'

ফেরাতেই দীপা দেখতে পেল, মণিমোহনের নেপালি দারোয়ানটা তাকে ডাকছে। চল্লিশ- মিনিট আগে যখন প্রথম সে ওই গেটটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল দারোয়ানটা তাকে

তখনই দারোয়ানের চোখে দীপা অনেকটা নেমে গেছে। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে “সে এখন আওরত বলে ডাকছে।

চোখাচোখি হতেই দীপার সেই পুরোনো সুটকেসটা ফুটপাথে ছুড়ে দিল দারোয়ান। তখনই দীপার মনে পড়ল, সুটকেসটা মণিমোহনদের ড্রইংরুমে ফেলে সে চলে এসেছিল।

কয়েক পা পিছিয়ে এসে সুটকেসটা তুলে নিল দীপা তারপর আবার চলতে শুরু করল। তার মনে হচ্ছিল, আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যেন।

তিন

হরপ্রসাদ সরণি যেখানে ডাইনে ঘুরে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তায় মিশেছে, সেই মোড়ের মাথায় রিকশার স্ট্যান্ড। দশ-বারোটা রিকশা সেখানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীপা মোড়ে এসে রিকশায় উঠে বলল, “ঢালিপাড়ার বস্তির কাছে চলো।” রেললাইনের ধারে ওই বিশাল বস্তিটা এই অঞ্চলের বিখ্যাত জায়গা। বিখ্যাত না বলে নোটোরিয়াস বলাই হয়তো ঠিক। সবাই জায়গাটা চেনে।

রিকশায় যেতে-যেতে দু-ধারের বাড়িঘর লোকজন গাড়ি-টাড়ি, কিছু চোখে পড়ছিল না দীপার। কিছুক্ষণ আগে মণিমোহনদের বাড়িতে যা-যা ঘটে গেল সেসব ভাবতে চেষ্টা করছিল সে। কিন্ত পরপর ধারাবাহিক ভাবে কিছুই যেন ধরতে পারছে না, ভাবনাটা ছিড়ে-ছিড়ে যাচ্ছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে বারবার অনীশের মুখটা তার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। ধূর্ত বেড়ালের মতো সরটুকু খেয়ে গৌফ মুছে অনীশ তার জীবন থেকে সরে পড়েছে। অথচ একদিন তাকে কি বিশ্বাসই না করেছিল! অসীম নির্ভরতায় নিজের সব কিছু তার হাতে সঁপে দিয়েছে দীপা। এর পরিণতি কী হতে পারে, একবারও চিস্তা করে দ্যাখেনি।

কিন্ত তার পেটে যে বাচ্চাটা এসেছে, একটু আগে তার দায়িত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করল অনীশ। শুধু কি তাই, অনীশ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, দীপাকে সে চেনে না, এমনকী কখনও দেখেনি পর্যস্ত। মানুষের এই বিশ্বাসঘাতকতা তার মাথার ভেতরে জুলস্ত পেরেকের মতা বারবার বিধে যাচ্ছিল।

দীপা অনীশ এবং মণিমোহনকে জানিয়ে এসেছে, সহজে তাদের ছাড়বে না। কিন্তু তারা সোসাইটির একেবারে নীচের লেভেলের মানুষ। তাদের কোনও জমকালো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে পুলিশ অফিসার, এমএলএ বা মন্ত্রী খুজে পাওয়া যাবে না। আর অনীশরা? ওরা আছে সোসাইটির সব চাইতে উঁচু স্তরে। অগাধ টাকা ওদের, প্রচুর ক্ষমতা এবং চারদিকে প্রচণ্ড ইনফ্লুয়ে্স। রাগ এবং উত্তেজনার ঝৌকে দীপা তো শাসিয়ে এল কিন্তু ওইরকম প্রবল শক্তিমান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সে লড়াই চালাবে কীভাবে? তার ক্ষমতা কতটুকু? এই অসম যুদ্ধে ওরা ইচ্ছা করলে তাকে গুঁড়িয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। কিছুক্ষণ আগেও শ্রিররদাড়া টানটান করে দীপা অনীশ এবং মণিমোহনের সঙ্গে দাতে দাত চেপে সামনে লড়ে গেছে। কিন্তু এখন উত্তেজনা কেটে যাওয়ার পর ন্নায়ুগুডলো ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে। অনীশরা যখন স্বীকারই ফরল না তখন অবৈধ সন্তানের মা হয়ে চরম অসম্মান আর দুর্নাম গায়ে মেখেই কি তাকে পৃথিবীত্তে বেঁচে থাকতে হবে? সে তো একরকম শেষ হয়ে যাওয়াই। ভেতরে-ভেতরে ভীষণ ক্লাস্ত আর বিপর্যস্ত বোধ করল দীপা। দু'হাতে মুখ ঢেকে জোরে মাথা নাড়তে-নাড়তে রুদ্ধ গলায় সে সামনে বলে যেতে লাগল, “পারব না, পারব না, পারব. না-_,

কখন যে রিকশাটা রেললাইনের ধারে ঢালিপাড়া বস্তির সুখে চলে এসেছে, দীপার খেয়াল

রণক্ষেত্র

ছিল না। রিকশাওয়ালা গাড়ি থামিয়ে বলল, “মাইজি-_-আ গিয়া__

আচ্ছন্নের মতো হাতের ভেতর থেকে মুখ তুলল দীপা। তারপর ভাড়া মিটিয়ে সুটকেসটা হাতে নিয়ে নেমে পড়ল।

দীপাদের বাড়িটা ঠিক বস্তির ভেতরে নয়। অঘোর নন্দী লেন নামের একটা সরু গলি বর্ডার লাইনের মতো মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। সেটার একধারে কুখ্যাত ঢালিপাড়া বস্তি, আর এধারে সারি-সারি পুরোনো ক্ষয়াটে চেহারার সব বাড়ি। বেশির ভাগই টিনের বা টালির। দুচারটে ইটের তৈরি একতলা যা আছে সেগুলোর বয়স যে কত, কেউ জানে না। জব চার্নকের সময়েই হয়তো ওগুলোর ভিত গাঁথা হয়েছিল। এইরকম একটা বাড়িতেই আরও তিন ভাড়াটের সঙ্গে দীপারা থাকে।

ওদের ভাঙাচোরা সদর দরজার পাল্লায় প্রচুর কাঠের টুকরো এবং টিনের তাপ্লি। নীচের দিকটা জলে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে অনেকটা ফাক হয়ে গেছে।

কাছাকাছি আসতেই দীপা দেখতে পেল, মা সদরের বাইরে দাড়িয়ে আছে।

দীপার মা কমলার বয়স পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন। একসময় বেশ সুন্দরীই ছিল মহিলা এখন সারা শরীর জুড়ে শুধু ধ্বংসের ছাপ। গায়ের রং কবেই জ্বলে গেছে। গাল ভেঙে চোয়ালের হাড় ঠেলে বেরিয়েছে। চোখদুটো ইঞ্চিখানেক গর্তে ঢোকানো। চুল উঠে-উঠে কপালটা একেবারে মাঠ।

এই মুহূর্তে কমলার পরনে মিলের আধময়লা লাল-পাড় শাড়ি আর সাদা জামা শির বার- করা সরু-সরু দুই হাতে দু-গাছা লোহা ছাড়া সমস্ত শরীরে ধাতুর চিহৃমাত্র নেই। অবশ্য লোহার সঙ্গে সধবার লক্ষণ হিসেবে দুটো শীখাও রয়েছে।

কমলা চাপা নীচু গলায় জিগ্যেস করল, “কী হল ওখানে? তার কণ্ঠস্বরে ভয় এবং উৎকণ্ঠা জড়ানো।

দীপা উত্তর দিল না, আচ্ছন্নের মতো মায়ের পাশ দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা নিজের ঘরে চলে এল।

এ-বাড়িতে সবসুদ্ধু খানছয়েক ঘর। ছিরিছাীদহীন ব্যারাকবাড়ির ঘরের মতো এগুলোও পরপর তোলা হয়েছে। সামনে দিয়ে টানা চওড়া বারান্দা।

বা-দিকে বারান্দার শেষ মাথার ঘর দুখানা দীপাদের। তার পরের দুটো ঘর নিয়ে থাকে প্রাইভেট ফার্মের এক কেরানি-_উমাপদ, তার স্ত্রী শিবানী এবং তাদের দু'টো ছোট-ছোট বাচ্চা। উমাপদর পরের ঘরটায় থাকে এক মধ্যবয়সি নার্স-_বিভা। সে একা নির্বাঞ্জাট মানুষ, মা-বাবা ছেলেপুলে বা খুব ঘনিষ্ঠ আস্্ীয়স্বজন বলতে তার কেউ নেই। বিভার পাশের ঘবটা এক হিন্দুস্থানি হকারের। নাম রাজেম্বর সিং, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। খুব ছোট্ট সংসার রাজেশ্বরের। স্বামী আর স্ত্রী মিলিয়ে মাত্র দূজন। স্ত্রী গঙ্গা বাজা বলে বাচ্চা-কাচ্চার ঝামেলা নেই। রাজেশ্বর সারা সকালটা বাঁধা খদ্দেরদের বাড়ি-বাড়ি খবরের কাগজ দেয়। তারপর বাকি দিন গড়িয়াহাটায় নানারকম ম্যাগাজিন-ট্যাগাজিন বেচে। ওখানে এক বাড়ির দেওয়ালে তার ছোটখাটো একটা স্টল আছে। সব মিলিয়ে এ-বাড়িতে মোটমাট চার ভাড়াটে।

টানা বারান্দার নীচে এক ফালি চাতাল। চাতালটা বহুকাল আগে সিমেন্ট দিয়ে বীধানো হয়েছিল। এখন ফেটে চাকলা-চাকলা সিমেন্ট উঠে ভেতরের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। ফাটা জায়গাগুলোতে জমে আছে শুকনো শ্যাওলার পুর আত্তর, আর গজিয়েছে ঘাস।

চাতালটার ডান দিকে টালির ছাউনি দেওয়া পরপর চারটে রান্নাঘর, বাঁ-দিকে কর্পোরেশনের কল, স্নান-্টান করার জন্য খানিকটা ঘেরা জায়গা আর দুটো পায়খানা এগুলো সবই এজমালি।

এই মুহূর্তে বাড়িতে লোকজন বেশি নেই। উমাপদ, রাজেম্বর এবং বিভাকে এ-সময়টা কখনই পাওয়া যায় না, যে যার কাজে বেরিয়ে যায়। আর দীপার ভাই পিস্টুর সঙ্গে বাড়ির সম্পর্ক

২২ পাঁচটি উপন্যাস

সামান্যই। দু-বেলা খাওয়া আর রান্তিরে ঘুমের সময়টুকু বাদ দিলে সারাদিনই সে বাইরে-বাইরে থাকে। নণ্টার পর থেকে বাড়িটা চলে যায় মেয়েদের দখলে।

এখন শিবানী আর গঙ্গাকে রান্নাঘরে দেখা যাচ্ছে। তারা খুবই ব্যস্ত। বারান্দায় শিবানীর বাচ্চাদুটো হুটোপাটি করছে। আর বাঁদিকের শেষপ্রান্তে একটা হাতল-ভাঙা খাটো চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে দীপার বাবা আদিনাথ

আদিনাথের বয়স যাট-বাষট্টি। কোনও একসময় লম্বা-চওড়া সুপুরুষ চেহারা ছিল তার। এখন শরীর-টরীর ভেঙ্চেরে একেবারে ধ্বংসন্ত্বপ হয়ে দীড়িয়েছে। পরনে রং জুলে-যাওয়া লুঙ্গি আর তালিমারা হাফশার্ট।

দীপাকে তার ঘরে ঢুকতে দেখে হাতের কাগজ একপাশে রেখে শশব্যস্তে উঠে দীড়াল আদিনাথ

এদিকে কমলাও মেয়ের পেছন-পেছন ঘরের ভেতর চলে এসেছিল। এই পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়িটার যা হাল তার সঙ্গে দীপার এই ঘরটা একেবারেই খাপ খায় না। ঘরটা ছিমছাম, চমৎকার সাজানো একধারে তক্তাপোশে ধবধবে বিছানা, আর-এক দিকে ছোট একটা আলমারি। সাজবার জন্য ড্রেসিং টেবল নেই। তবে দেওয়ালে একটা চৌকো ঝকঝকে আয়না লাগানো রয়েছে, সেটার সঙ্গে সুদৃশ্য কাঠের তাক জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আছে টুকিটাকি কণ্টা প্রসাধনের জিনিস-_ পাউডার, চিরুনি, ছোট একটা সেন্টের শিশি, ক্রিমের কৌটো, কুমকুম ইত্যাদি ইত্যাদি। একপাশে একটা ছোট পড়ার টেবলও রয়েছে, টেবলটার ওপর সুতোর ফুলতোলা সুন্দর টেবল ব্লথ। টেবলে রয়েছে মাটির সুদৃশ্য ফুলদানি, কলম, একটা চৌকো টেবল ক্লক আর ধূপদানি। দেওয়াল কেটে র্যাক বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের কিছু বই ব্রাউন পেপারের মলাট দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

কমলা বলল, “অনীশদের ওখানে কী হয়েছে, বলনি না তো?

দীপা এবারও উত্তর দিল না। হাতের সুটকেসটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে নিজেকে একরকম বিছানায় ছুড়েই দিল সে এবং বালিশে মুখ গুঁজে চুপচাপ পড়ে রইল।

কমলা আবার বলল, “অনীশদের বাড়ি যাওয়ার সময় বলেছিলি ফিরবি না। তা হলে-__" কথা শেষ না করেই থেমে গেল সে।

কমলার না-বলা কথার মধ্যে অনুচ্চারিত একটা প্রশ্ন ছিল। সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না দীপার। তবু সে চুপ করেই থাকে। যেভাবে কিছুক্ষণ আগে দীতে দীত চেপে প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মণিমোহনের সঙ্গে সে যুদ্ধ করেছে তাতেই তার সবটুকু শক্তি শেষ। এই মুহুর্তে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তার। এমনকী কারও সঙ্গই ভালো লাগছে না।

কমলা তক্তাপোশের কাছে এসে দীড়াল। অনেকটা ঝুঁকে জিগ্যেস করল, “ওদের সঙ্গে দেখা হয়নি?

মা যেভাবে একটানা ঘ্যানঘ্যান করে চলেছে তাতে কতক্ষণ আর মুখ বুজে থাকা যায়! অবশ্য মাকে দোষও দেওয়া যায় না। তার সম্পর্কে মায়ের উৎকগ্ঠা এবং দুর্ভাবনা তো থাকবেই। অনিচ্ছাসত্তেও দীপা এবার বলল, “হয়েছে।,

“তবে?

“তোমার কী ধারণা, ওরা আমাকে বরণ করে ঘরে তুলে নেওয়ার জম্যে হাত ধুয়ে বসে

ছিল? শ্বাস টানার মতো শব্দ করে কমলা বলল, “কিন্তু তুই তো ওখানে থাকার জন্যেই গিয়েছিলি।' দীপা বালিশ থেকে মুখ না তুলেই বলল, “হ্যা, গিয়েছিলাম। নিজের সম্মান আর ভবিষ্যতের জন্যে আমাকে তো চেষ্টা করতেই হবে। কিস্তু-_,

রণক্ষেত্র

“কিন্তু কি?

তমি কি জানো-_” দীপা বলতে লাগল, “ওদের বাড়িতে কত চাকরবাকর আর দারোয়ান আছে!

কমলা বলল, “থাকতেই পারে। তুই তো বলেছিস, ওরা খুব বড়লোক।'

একটু চুপ করে থাকল দীপা। তারপর বলল, “চাকর-দারোয়ান ডেকে অনীশের বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে।

শঙ্কিত মুখে কমলা জিগ্যেস করল, “চাকরেরা তোর গায়ে হাত তুলেছে নাকি?

“নিজের থেকে না বেরিয়ে এলে তুলত।'

দরজার বাইরে একটা চাপা ফ্যাসফেসে গলা শোনা গেল, “হারামীদের এতবড় আম্পর্ধা! আমার মেয়ের গায়ে হাত তুললে চামড়া গুটিয়ে দিয়ে আসতাম।”

আদিনাথের গলা। মুখ না তুলেও দীপা টের পেল, বাবা বারান্দার কোণ থেকে উঠে এসে দরজার কাছে দীড়িয়ে আছে।

আদিনাথের এই আস্ফালনের দাম কানাকড়িও নয়। দীপা জানে, দুর্বল ভীরুর পাল দূর থেকেই চোটপাট কবে। কাছে যাওয়ার সাহস তাদের নেই। নইলে দীপার এমন মারাত্মক ক্ষতির কথা জানবার পরও বাড়িতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকত না আদিনাথ। দৌড়ে গিয়ে অনীশের টুটি ধরে টেনে এনে ম্যারেজ-রেজিস্ট্রারের কাছে চলে যেত। এসব না করে বাড়িতে বসেই সে শুধু চেঁচামেচি করছে।

কমলাও জানে, তার স্বামীর দৌড় কতটা। তার কথার উত্তর না দিয়ে দীপাকে জিগ্যেস করল, 'অনীশ তখন ও-বাড়িতে ছিল?

দীপা বলল, “ছিল। তার সামনেই তো ওর বাবা আমাকে অপমান করল।'

কমলা চমকে উঠল, “অনীশ দীড়িয়ে-দাড়িয়ে সব দেখল? বাপকে কিছু বলল না!”

“কিছু না। উলটে জানালো, সে আমাকে চেনে না। কোনও জন্মে দেখেনি। ভয় দেখিয়ে আমি নাকি ওদের বাড়িতে ঢুকতে চাইছি।'

বাইরে চাপা হিংস্র গলায় গর্জে উঠল আদিনাথ, “বিশ্বাসঘাতক_ জানোয়ার ।'

কমলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। তার পায়ের জোর যেন আলগা হয়ে যাচ্ছিল। মাথাটা ভয়ানক টলছিল। আবছা গলায় বলল, “এতবড় সর্বনাশ করার পর এমন কথা বলতে পারল অনীশ? মুখে বাধল না!'

দীপা কিছু বলল না। হঠাৎ সে টের পেল, চোখের মণি ফাটিয়ে জলের শ্বোত বেরিয়ে আসছে।

দীপার পিঠে একটা হাত রেখে কমলা খুব আস্তে করে ডাকল, “বুনা__,

দীপা অনুভব করল, মায়ের হাতটা ভয়ানক কাপছে। তার ছোঁয়ার মধ্যে ভয় উদ্বেগ মমতা, এমনি কত কি যে মেশানো। সে বলল, “কী বলছ মা

কমলা বলল, “এখন কী করবি তুই? ওরা তোকে এভাবে তাড়িয়ে দিল!

অনীশদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর দীপা এতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যে-কোনও কিছুই স্পষ্ট ভাবার শক্তিটুকু পর্যস্ত অবশিষ্ট নেই। পেটের বাচ্চাটাকে নিয়ে সে কী করবে, তার গর্ভবতী হওয়ার খবরটা জানাজানি হওয়ার পর লোকে তার গালে কী পরিমাণ চুনকালি মাখাবে, তার জন্য কতটা অসম্মান দুর্নাম অপেক্ষা করছে- এই মুহূর্তে এসব চিস্তা করতে পারছে না দীপা। মায়ের কথায় মাথার ভেতর প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে গেল যেন। শিরদীড়ার ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকের মতো কিছু ওঠানামা করতে লাগল। আচমকা উদ্ত্রান্তের মতো মুখটা বালিশে ঘষতে- ঘষতে সে চিৎকার করে উঠল, “যাও তোমরা, যাও। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না-__কিচ্ছ্ু

২৪ পাঁচটি উপন্যাস

ভালো লাগছে না।'

কমলা আর দাঁড়াল না। ভয়ে-ভয়ে মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।

মুখ না ফিরিয়ে দীপা টের পেল, বাবাও দরজার পাশ থেকে সরে গেছে।

অনেকক্ষণ পর অস্থিরতা কমে এল দীপার। উত্তেজিত স্রাযুগ্ডলো ক্রমশ শান্ত হয়ে আসছে। আস্তে-আস্তে মুখ তুলল সে। থুতনিটা বালিশে ডুবিয়ে দূরমনক্ষর মতো সামনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

জানালার গা ঘেঁষে একটা নিমগাছ। নীচে কিছু আগাছা, ভাঙা ইটের টুকরো, কাচের টুকরো, নানা রকমের জঞ্জাল, ইত্যাদি। তার পরেই ভাঙাচোরা পাঁচিল। পাঁচিলের পর সরু গলি। গলি পেরিয়ে এঅঞ্চলের বিখ্যাত ঢালিপাড়ার বস্তি। বস্তির মুখে দু-তিনটে মুদি দোকান, পান-বিড়ির দোকান, আর আছে চায়ের স্টল। এই স্টলগুলোর সামনে কাঠের বেধে চিরস্থায়ী একটি ভিড় সারাক্ষণ অনড় হয়ে থাকে। দিনরাত ওখানে হইহল্লা, চিৎকার, খিস্তি।

চায়ের দোকানগুলো দেখে ওদের সত্যিকার চেহারা বোঝার উপায় নেই। বাইরে বিরাট উনুনে চব্বিশ ঘণ্টা চায়ের জল ফুটছে। একপাশে সারি-সারি বোয়েমে নোনতা বিস্কুট আর বাজে বেকারির রদ্দি পাউরুটি সাজানো বস্তির লোকেরা এসে চা-বিস্কুটও খায়, রুটিও কেনে আদতে এগুলো ধোৌকাবাজি। এদের আসল কারবারটা সামনের দিকে নয়, পেছনে সেখানে রয়েছে জালা বোঝাই তাড়ি আর দিশি চোলাই মদের সারি-সারি বোতল।

সন্ধের পর দোকানগুলোতে ভিডটা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে বাড়ে হল্লা এবং চিৎকার। এক-এক দিন মাতলামির ডিগ্রি চড়ে গেলে ছুরি মারামারি কিংবা বোমাবাজি শুরু হয়ে যায়।

বস্তির পর রেললাইন। তার ওধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে রেল ইয়ার্ড। সেখানে বন্ধে মাদ্রাজ হরিয়ানা থেকে মাল বোঝাই হয়ে অগুনতি ওয়াগন আসে। সর্বক্ষণই ওখানে কয়েকশো ওয়াগন দাঁড়িয়ে থাকে। ঢালিপাড়া বস্তির সমস্ত সমস্যা এবং ঝামেলার উৎস ওই ওয়াগনগুলো।

এখানে ওয়াগন ব্রেকারের তিন-চারটে গ্যাং আছে। ওয়াগনের দখল নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায় রোজ খুনোখুনি তো হচ্ছেই, তার ওপর রয়েছে রেলপুলিশের সঙ্গে প্রতি রাত্রেই এনকাউন্টার। বোমা রাইফেল আর স্টেনগানের শব্দে তখন সমস্ত এলাকা থরথর কাপতে থাকে।

এই মুহূর্তে বস্তির মাথায় যে আকাশের লম্বাটে অংশটা দেখা যাচ্ছে সেখানে এলোমেলো টুকরো-টুকরো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর চোখে পড়ছে কণ্টা চিল। অলস ডানা মেলে তারা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

দীপা বস্তির মাথায় স্কাইলাইন, মেঘ, চিল, চায়ের দোকান-__কিছুই দেখছিল না। কয়েকমাস আগের একটা রাতের ছবি তার চোখের সামনে অদৃশ্য কোনও স্ক্রিনে যেন ফুটে উঠছিল।

এ-বছর মারাত্মক বর্ধা গেছে। কলকাতার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছিল, পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এত বৃষ্টি আর হয়নি। অর্ধশতাব্দীর এই রেকর্ড বর্ষণে কলকাতা একেবারে ডুবে গিয়েছিল।

জুন মাসের মাঝামাঝি সেই দিনটায় খুব সম্ভব এ-বছরের সব চাইতে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। সকাল থেকেই পাহাড়ের মতো কালো ভারি মেঘে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। যণ্ত বেলা .বাড়ছিল, মেঘের ভারে আকাশটা যেন ঝুলে পড়ছিল।

ভোর হতে-না হতেই অয-আলল বৃষ্টি শুরু হয়েছে সেদিন। কিন্তু তা দেখে বিকেল পর্যন্ত বোঝা যায়নি, সন্ধের সময় গোটা শহর লগুভগ্ড করে অমন বিপর্যয় ঘটে যাবে।

তখন ভবানীপুরে বিকেলের দিকে একটা টিউশনি করত দীপা। আড়াইটে কি তিনটে বাজলে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। বেরুবার মুখে কমলা বলেছিল, “আকাশের যা অবস্থা, আজ

রণক্ষেত্র

না হয় পড়াতে না-ই গেলি।,

দীপা বলেছে, “যে মেয়েটাকে পড়াই, আসছে সপ্তাহে তার হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা। এখন না গেলে চলে!

“কিন্তু জোরে বৃষ্টি নামলে মুশকিলে পড়ে যাবি। ফিরবি কী করে£ কমলাকে বেশ চিস্তিত মনে হয়েছিল।

দীপা বলেছে, “সকাল থেকেই তো মেঘ জমে আছে। জোরে বৃষ্টি নামার হলে এতক্ষণে নেমেই যেত। মনে হচ্ছে সারাদিনই এইরকম গুঁড়ি-গুঁড়ি পড়বে।,

“বেরুবিই যখন, বেশি দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি পড়িয়েই চলে আসিস।,

“ঠিক আছে।,

ভবানীপুরে পৌছুতে-পৌঁছুতে চারটে বেজে গিয়েছিল। ঘণ্টাখানেকের বেশি সে তার ছাত্রীটিকে পড়ায়নি। পাঁচটা যখন বাজে, ছাত্রীর মা-ই তাকে তাড়া দিয়ে উঠিয়ে দিয়েছিল। “আজ আর পড়াতে হবে না। শিগগির বাড়ি চলে যান। মেঘের যা চেহারা হচ্ছে, চারদিক ভাসিয়ে দেবে।”

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চমকে উঠেছিল দীপা আকাশের যে রং দেখে সে বেরিয়েছিল, এর মধ্যে কখন যেন তার গায়ে কেউ আরও দশ পোঁচ আলকাতরা লাগিয়ে দিয়েছে। মেঘের পাহাড় কলকাতার ওপর আরও অনেকখানি নেমে এসেছে।

ছাত্রীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সবে বাস রাস্তায় এসেছে দীপা, আকাশটাকে ভেঙে-চুরে বৃষ্টি নেমে গেল,